একজন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা শরিফ সোহেলের সংগ্রামী ইনিংসের আদ্যোপান্ত
২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:১২ অপরাহ্ন

  

একজন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা শরিফ সোহেলের সংগ্রামী ইনিংসের আদ্যোপান্ত

আব্দুল জলিল
০২-১২-২০২০ ০৫:১৩ অপরাহ্ন
একজন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা শরিফ সোহেলের সংগ্রামী ইনিংসের আদ্যোপান্ত

আবদুল জলিলঃ বন্ধুদের নিকট তিনি সোহেল। তিনি নিজেকে প্রকাশ করেন শরিফ সোহেল হিসেবে। আর সনদে তিনি মো. শরিফুল ইসলাম ওরফে সোহেল। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার চালিতাডাঙ্গা ইউনিয়নের তাঁত সমৃদ্ধ বর্শিভাঙ্গা গ্রামের শরিফ সোহেল স্নাতক শেষ করে চাকরির পিছে ছোটেননি। তার এক ভাই সরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে পেশা শুরু করলেও তিনি ভাবলেন গ্রামের মানুষের কথা। ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছেন কিভাবে বছরের একটি বিশেষ সময় শ্রমিকদের হাতে একেবারেই কোন কাজ থাকে না। আর পড়ালেখা শিখে কত যুবক বেকার হয়ে সংসারের নিকট থাকে অপাংক্তেয়।

 এসব ভেবে তিনি তার পাশের গ্রামের শিমুলদাইড় বাজারের ঝুট কম্বল তৈরির ব্যবসায় মনোযোগ দেন। এক বছর তিনি ব্যবসায়ীদের সাথে থেকে দেখলেন সবকিছু। এরপর কম্বলের চাহিদার বিষয়টি চিন্তা করে শুরু করলেন ঝুট কম্বল তৈরির ব্যবসা। শিমুলদাইড় বাজারে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন নিজের কারখানা। নাম দিলেন মেসার্স সহীহ ট্রেডার্স।

সেই থেকে তার স্বপ্নের পথে চলা শুরু। প্রথম বছরেই তিনি মুনাফার মুখ দেখেন। মাত্র ১০ জন শ্রমিক নিয়ে শুরু করেন তিনি। সুদূর প্রসারী চিন্তা চেতনা থেকে তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে কম্বলের ব্যবসার প্রচার এবং প্রসারে মনোযোগ দেন। বেশ কয়েকটি পত্রিকায় এবং চ্যানেলে নিউজ কাভার হয়। মানুষ জানতে চিনতে শুরু করে এই শিল্প সম্পর্কে।দিনে দিনে চাহিদাও বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে তিনি দেশের নানাপ্রান্তের কম্বল ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ করেন। বুঝতে পারেন শুধু মাত্র ঝুটের জোড়া কম্বল তৈরি করে মার্কেট ধরে রাখা যাবে না। নিজের এই চিন্তা থেকে তিনি আমদানী করেন পুরো জোড়াবিহিন কম্বলের রসদ।

শুরু হয় নতুন গল্পের। এরই সাথে শিশু পোশাক তৈরিও শুরু করেন। এক কম্বলই তিনি নানা ডিজাইনে নানা আকারে তৈরি করা শুরু করেন। এরকম হতে হতে তার কারখানায় এখন ৪৪ প্রকার কম্বল তৈরি হচ্ছে।শরিফ সোহেল জানান, প্রতি বছরই তার ব্যবসার প্রসার ঘটছে। চাহিদাও বাড়ছে।  বর্তমানে তার কারখানায় একশ জন দক্ষ শ্রমিক কাজ করে। এরসাথে প্রতিদিন সহায়তাকারী ২০ জন, ভ্যানগাড়ি, ট্রাক, পিকআপ মিলে ৫০ জন শ্রমিক কাজ করে। প্রতিবছর পিক সিজন অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দিনে প্রায় দুইশ শ্রমিক তার কারখানায় কাজ করে।আর এমনিতে জুলাই থেকে কাজ শুরু হয়।  

 শরিফ সোহেল জানান, প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ টি গাড়ি লোড আনলোড হয় এই বাজারে। আর এবছর দেশের ৪১ টি জেলায় যাচ্ছে তার তৈরি বিভিন্ন নামের ও ডিজাইনের কম্বল। তিনি জানান, এই বাজারে বছরে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়।আর শিমুলদাইড় বাজারে এই শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে এলাকার প্রায় পাঁচশ মানুষ বিভিন্ন ধাপে এই কাজ করছে। আর পুরো কাজিপুরের প্রায় ত্রিশ হাজার পুরুষ ও নারী এই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এই শিল্পের প্রসারের ফলে পরিবর্তন হয়েছে অনেকের ভাগ্যের। এক সময়ের বেকার হাত  এখন কর্মের হাতে পরিণত হয়েছে। ছোন-বন আর টিনের তৈরি আবাস পরিবর্তন হয়ে এখন হচ্ছে পাকা বাড়িঘর।হাতে তাদের খরচ বাদে জমছে টাকা।

আর এই পরিবর্তনের নেপথ্যের কারিগর শরিফ সোহেল। স্থানীয় প্রশাসন গত বছর থেকে দিয়ে যাচ্ছে যোগ্য সহায়তা। এবছর কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরিফ সোহেলের বেকার দূরীকরণের এই প্রত্যয়দীপ্ত কর্মকান্ডে মুগ্ধ হয়ে এগিয়ে এসেছেন এই শিল্পের প্রসারের কাজে। এবছর তিনি দেশের প্রত্যেকটি উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং পদস্থ কর্মকর্তাদের নিকট শীত মৌসুমে কাজিপুরের শিমুলদাইড় বাজারে তৈরি কম্বল ক্রয়ের আহবান জানিয়ে ডিও লেটার পাঠিয়েছেন। আর তাতে করে সাড়াও মিলছে।

কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহিদ হাসান সিদ্দিকী জানান, এরইমধ্যে দশ থেকে বারজন কর্মকর্তা তার সাথে কম্বল ক্রয়ের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। দামে সস্তা এবং মানে ভালো হওয়ায় দিন দিন এর চাহিদা আরও বাড়বে বলে তিনি জানান।

 শরিফ সোহেল চাহিদার কথা মাথায় রেখে তিনি কম্বলের মানের দিকে মনোযোগ দেন। এই বাজারে চায়না কম্বলের আদলে তিনি তার কারখানাতে কম্বল তৈরি প্রথম শুরু করেন এবং ব্যাপক সাফল্য পান।  নগদ টাকার কারবার তিনি ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে গেছেন। এতে করে ঝুঁকিমুক্ত থাকা যায়। বাজারের অন্যান্য ব্যবসায়ীদের তিনি পরামর্শ দিয়ে নতুন নতুন পণ্য তৈরির নানা দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।যে কারো প্রয়োজনে তিনি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। নতুন নতুন যে ডিজাইন এবং কাঁচামাল বাজারে পাওয়া যায় তিনি নিজে প্রথম সেগুলো খুঁজে নিয়ে আসেন। পরে সবার সাথে শেয়ার করেন। এতে করে পুরো বাজার এখন ঝুট কম্বলের পাশাপাশি মানসম্মত কম্বল ও নানা ধরণের শিশু পোশাক তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এখনতো দিনরাত কাজ চলছে।প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ টি গাড়ি এই বাজার থেকে দেশের নানা প্রান্তে এই পন্য নিয়ে যাচ্ছে। বাজারের ব্যবসায়ী ফরিদুল ইসলাম জানান, শরিফ সাহেব আমাদের ব্যবসার পথ প্রদর্শক। তিনি নতুন নতুন কাজের ধরণ এবং বাজার ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের সাথে শেয়ার করেন। এতে করে আমরা সবাই উপকৃত হই।

 শরিফ সোহেলের আর একটি স্বপ্ন এই প্রতিবেদককে জানান। ফ্রেব্রিক্স এর চায়না মিল দেবার ইচ্ছেটা পূরণ করতে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন এটি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে এলাকার আরও কমপক্ষে ৫০০ জন বেকারের কর্মসংস্থান সম্ভব হবে। তিনি জানান যে চায়না কম্বল মার্কেটে তিন হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকায় বিক্রয় হয় সেই রকম কম্বল আমরা এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশ টাকায় বিক্রি করি। এই মিলটি করা সম্ভব হলে এখানকার কাজেরও গুণগতমান বৃদ্ধি পাবে। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।

 এবছর চাহিদার বিষয়ে শরিফ সোহেল জানান, প্রতিদিন যে পরিমাণ অর্ডার পাচ্ছি তাতে করে সরবরাহ  দিতে হিমশিম খাচ্ছি। ধারণাই ছিলো না এতো অর্ডার আসবে। তিনি বলেন, কাজিপুরের ইউএনও জাহিদ স্যার আমাদের সমর্থন দিচ্ছেন এবং এই শিল্পের প্রসারে ভূমিকা রাখছেন। এজন্যে স্যারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এই বাজারের প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লক্ষ টাকার লেনদেন হয়। অথব সরকারী কোন ব্যাংকের শাখা নেই। নেই মালিকদের জন্যে ব্যাংক লোনের সুবিধা। এসব বাধা দূর করতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দুষ্টি আকর্ষণ করেন।

 সবশেষে তিনি নিজের স্বপ্নের কথা জানান। তার কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের ছেলেমেয়েদের জন্যে তিনি শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থাসহ নানা সুযোগ সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেইসাথে শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্যে একটি তহবিল গঠনের কথা জানান।

 স্বপ্নবাজ শরিফ সোহেলের স্বপ্নের ডালাপালা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ুক। এমন একজন স্বপ্নের ফেরিওয়ালার মাধ্যমে হাজারো স্বপ্নের ধারা রচিত হোক সবার মনে এমন প্রত্যাশা করেন এই পেশায় জড়িত হাজারো শ্রমিক।# শরিফ সোহেল- ০১৭৫১-০৬১১৩১


আব্দুল জলিল ০২-১২-২০২০ ০৫:১৩ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 726 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com