শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক বিকাশে কাব স্কাউটিং -সুখময় সরকার
স্কাউটিং একটি স্বেচ্ছাসেবী, অরাজনৈতিক, ধর্ম নিরেপেক্ষ ও শিক্ষামূলক আন্দোলন।জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে স্কাউটিং সকলের জন্য উন্মুক্ত। কাব স্কাউট আন্দোলনের উদ্দেশ্য হল শিশুদের শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক আধ্যাত্মিক ও মানসিক দিকগুলো পরিপূর্ণ অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বিকাশে অবদান রাখা যাতে করে তারা ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তি, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে জীবনযাপন করতে পারে। মানবজীবনের একমাত্র ব্রত হল সেবা। মানবহৃদয়ের সব তৃপ্তি, সুখ ও সাফল্য সেবার মধ্যেই নিহিত। ‘সেবা’র মূলমন্ত্র নিয়ে ১৯০৭ সালে ইংল্যান্ডের ব্রাউন সি দ্বীপে রবার্ট স্টিফেনশন স্মিথ লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল অব গিলওয়েলের হাতধরে গড়ে উঠেছিল স্কাউট আন্দোলন। মাত্র ২০ জন কিশোর নিয়ে প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজ বিশ্বের ১৬৯টি দেশে স্বীকৃতভাবে ৪০ মিলিয়নের অধিক স্কাউটার রয়েছে, যারা বিশ্বের আনাচে-কানাচে নিরলসভাবে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত।
বাংলাদেশে স্কাউট আন্দোলনের সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। ১৯৭২ সালের ৮-৯ এপ্রিল সারাদেশের স্কাউট নেতারা ঢাকায় এক সভায় মিলিত হয়ে গঠন করেন বাংলাদেশ স্কাউট সমিতি। ওই বছরের সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতির ১১১নং অধ্যাদেশ বলে (১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭২, সোমবার) ওই সমিতি সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্ব স্কাউট সংস্থা ১৯৭৪ সালের ১ জুন বাংলাদেশ স্কাউট সমিতিকে ১০৫তম সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে ১৯৭৮ সালের ১৮ জুন পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল সভায় সমিতির নাম বদল করে রাখা হয় বাংলাদেশ স্কাউটস।স্কাউট আন্দোলন পরিচালনার জন্য ৭টি আইন এবং একটি নির্দিষ্ট শপথ বাক্য আছে। বাংলাদেশ স্কাউট কার্যক্রম শুরু করেছিল মাত্র ৫৬৩২৫ জন সদস্য নিয়ে। তবে স্কাউটের বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখের কাছাকাছি। স্কাউটদের সংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্ব স্কাউটে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বাংলাদেশ স্কাউট অগ্রাধিকার কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯টি উচ্চ পর্যায়ে জাতীয় কমিটি গঠন করছে। যেগুলোর সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বিশিষ্ট ও অভিজ্ঞ স্কাউটরা। বাংলাদেশ স্কাউটসের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ হচ্ছে জাতীয় স্কাউট কাউন্সিল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও চিফ স্কাউট এ কাউন্সিলের প্রধান। স্কাউট আন্দোলন সকল ধরণের ছেলে-মেয়েদের জন্য উন্মুক্ত। সুষ্ঠু পরিচালনার সুবিধার্থে বাংলাদেশে স্কাউটিং ৩ টি শাখা বা স্তরে বিভক্ত। ১ম স্তর হলো কাব স্কাউট। যে সকল কিশোর-কিশোরীর বয়স ৬ বছরের বেশি কিন্তু ১১ বছরের কম তাদের কাব স্কাউট বলা হয়ে থাকে। ২য় স্তর হলো স্কাউট। যে সকল বালক-বালিকার বয়স ১১ বছর বা তার চেয়ে বেশি কিন্তু ১৭ বছরের কম তাদের স্কাউট বলা হয়ে থাকে। ২য় স্তর হলো রোভার স্কাউট। যে সকল তরুণ-তরুণী কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে অথবা যাদের বয়স ১৭ বা তার চেয়ে বেশি কিন্তু ২৫ বছরের কম তাদেরকে রোভার স্কাউট বলা হয়ে থাকে। রেলওয়ে, বিমানসহ ও অনুরূপ প্রতিষ্ঠানে চাকুরীজীবীদের জন্য বয়স ৩০ বছর পর্যন্ত শিথিলযোগ্য।
কাব অর্থ শাবক বাচ্চা। স্কাউটিং এ ‘কাব’ অর্থে নেকড়ে বাঘের বাচ্চাদের কথা বুঝানো হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী (৬-১১ বছর বয়সের) বাচ্চাদের এই নামকরণের মধ্য দিয়ে উদ্যমী ও সাহসী করে তোলা হয়। কাবের মূলমন্ত্র বা আইন হলো: ১। বড়দের কথা মেনে চলা ২। আল্লাহ/ সৃষ্টিকর্তাও দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করা ৩। প্রতিদিন কারো উপকার করা ৪। আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব অর্থাৎ কোনো কাজে বিফলতায় মুখ ফেরানো নয়। বার বার চেষ্টা করে সফলতা আনা।এই আইনগুলো যদি সঠিকভাবে শিশুদের শেখানো হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে তারা স্কুল গন্ডির বাইরে গিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করবে এবং নিজেদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে।
উন্নত সোনার বাংলার স্বপ্নসারথি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রথম চিফ স্কাউট। অর্থাৎ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম প্রধান স্কাউট ব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতার পর তিনি স্কাউটিংয়ের দীক্ষা নিয়ে চিফ স্কাউটের দায়িত্ব নেন। ১৯৭২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির ১১১নং অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় স্কাউট সংগঠনকে স্বীকৃতি দেন। আজকের তরুণ, আগামীর বাংলাদেশ। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে ছোট সোনামণিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, বাংলাদেশ আজ যতদূর এগিয়েছে, ভবিষ্যতে আজকের শিশু-কিশোর-তরুণ বাংলাদেশকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন স্কাউট প্রশিক্ষণ পায়।’ স্কাউটিং কার্যক্রমই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রগতিশীল, সৃজনশীল ও উন্নয়নের পথে সম্পৃক্ত করে দেশকে জাতির পিতার কাঙ্খিত সোনার বাংলায় রূপান্তর করতে।আমাদের শিশুদেরকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য লেখাপড়ার পাশাপাশি স্কাউটিংয়ে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। স্মার্ট বাংলাদেশের ৪টি স্তম্ভের একটি হলো স্মার্ট সিটিজেন। শিশুদেরকে স্মার্ট সিটিজেন হিসেবে গড়তে পারলে বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
স্কাউট কথাটি বললেই একজন আদর্শ সুনাগরিককে বোঝায়। শিশুকালেই এ বীজ বপন করতে হবে। যার জন্য প্রয়োজন পারিবারিক শিক্ষা। পরিবার থেকে এবং পরর্বতীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিশুকে যদি গাইড করা হয় তবে সে একজন সুনাগরিক হতে বাধ্য। আর একজন সুনাগরিক পরিবার সমাজ এবং দেশেরে জন্য মহামূল্যবান সম্পদ। হাতে কলমে কাজ শেখা, ছোট দল পদ্ধতিতে কাজ করা, ব্যাজ পদ্ধতির মাধ্যমে কাজের স্বীকৃতি প্রদান, মুক্তাঙ্গনে কাজ সম্পাদন, তিন আঙ্গুলে সালাম, ও ডান হাত করর্মদন, স্কাউট পোশাক, স্কার্ফও ব্যাজ পরিধান এবং সর্বদা স্কাউট আইন ও প্রতিজ্ঞা মেনে চলা। কাবদের মূলমন্ত্র হচ্ছে–যথাসাধ্য চেষ্টা করা। কাব স্কাউট কার্যক্রমে রয়েছে : সাপ্তাহিক ক্লাশ, ক্যাম্প ও হাইকিং, কমডেকা, এবং বড় সমাবেশ যথা ক্যাম্পুরি আয়োজন করা হয়ে থাকে জাতীয়, আঞ্চলিক, জেলা বা উপজেলা র্পযায়ে (এগুলি আন্তর্জাতিকভাবে) বিশ্ব স্কাউট সংস্থাও করে থাকে। মূলত স্কাউটিং হলো একটি আন্দোলন যার কাজ আনন্দের মধ্য দিয়ে শিক্ষা দান। স্কাউটিং এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে অপার আনন্দ যার স্বাদ নিতে হলে যোগদান করতে হবে এই আন্দোলনে। কাবেরা কাজ শেখে ক্যাম্পিংয়ের মাধ্যমে। নিজেদের কাজ নিজেরা করে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে দলগতভাবে কাজ করে। এর ফলে মিলে মিশে কাজ করা শেখে এবং নেতৃত্ব দেয়ার গুণাবলী অর্জন করে যা পরবর্তী জীবনে তাদেরকে দায়িত্বশীল মানুষ হতে পরিণত করে। শহর অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা শুধু স্কুল আর বাসা পর্যন্ত আসা-যাওয়া করে, বাইরের জগৎ সম্পর্কে তাদের ধারণা কম থাকে। তাদের কায়িক পরিশ্রমও কম হয়। কাবিং কার্যক্রমে বাইরের খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের নিজের কাজ নিজে করা শেখানো হয়। এ কারণে শিশুদের কাবিং কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।কাবিং এর মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তারা নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারবে। কাবদের নিজস্ব পোশাক থাকে।কাবিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের আঙ্গুলের বিশেষ কায়দায় সালাম দেয়া ও গ্রহণ করা, ডান হাতে করমর্দন করা ইত্যাদি বিষয় শেখানো হয়। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুরা নিয়মশৃঙ্খলার বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে যা পরবর্তী জীবনে তাদের চিন্তা, কথা ও কাজে নির্মল হতে সাহায্য করে।শিশুরা আনন্দময় পরিবেশ ভালোবাসে। তারা আনন্দের মাঝে বড় হতে চায়। আনন্দের মাঝে নতুন কিছু শিখতে চায়। কাব স্কাউটিং কার্যক্রম এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই, সুন্দর আগামী গঠনে প্রতিটি বিদ্যালয়ে এই কার্যক্রমকে গতিশীল করা উচিত।
সর্বশেষ বলা যায়, স্কাউটিং মানুষকে সামাজিক ও সমাজবদ্ধ করে। স্কাউটিং সামাজিক ঐক্য ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে। স্কাউটরা অবসর সময়কে সফলভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ পায় এবং নিজ, পরিবার, সমাজ তথা বৈশ্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। কাব হচ্ছে স্কাউট আন্দোলনের প্রথম স্তর। কাব স্কাউটের সংখ্যা ও মান যত বৃদ্ধি পাবে স্কাউটিংয়ের তত প্রসার ঘটবে। কাব বয়সী ছাত্রছাত্রীদের সৎ মনমানসিকতা সৃষ্টি, সঠিক দিকনির্দেশনা দান, যথাযথ শারীরিক বিকাশ ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত রাখার জন্য কাব স্কাউটিং কার্যক্রম অত্যন্ত সহায়ক। সম্প্রতি দেশব্যাপী প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাব দল গঠন ও সুষ্ঠুভাবে দল পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
লেখক: উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ সাসেক্স হতে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন এন্ড লজিস্টিকস ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর।