প্রাথমিক শিক্ষার বিকাশে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির ভূমিকা
১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:২৬ অপরাহ্ন

  

প্রাথমিক শিক্ষার বিকাশে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির ভূমিকা

আব্দুল জলিল
০৯-০৯-২০২৩ ০৬:০৫ অপরাহ্ন
প্রাথমিক শিক্ষার বিকাশে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির ভূমিকা

সুখময় সরকার

মানসম্মত শিক্ষা সুনাগরিক গড়ে তোলার অন্যতম প্রতিজ্ঞা । যা স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। প্রাথমিক শিক্ষা হলো তার সূতিকাগার। বর্তমান বাংলাদেশে সরকারের বহুমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম অংশ হলো প্রাথমিক শিক্ষা। শিক্ষক নিয়োগ, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের  উপবৃত্তি প্রদান,  শিক্ষক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ,  বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণসহ রয়েছে নানামুখী কর্মকাণ্ড। একটা শিক্ষা  প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন এলাকার শিক্ষানুরাগী, হিতৈষী ব্যক্তিবর্গ। সেখানে থাকে তাদের ত্যাগ, ভালবাসা আর সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন। কিন্তু বিদ্যালয়টি সরকারি হওয়ার পরে অনেক সময় তারা বিদ্যালয় থেকে দূরে সরে যান। নিজেদের মালিকানাবোধ হারিয়ে ফেলেন বলে মনে করেন। কোন কোন ক্ষেত্রে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি তাদের নিয়মিত কর্তব্য পালনে সক্রিয় কম থাকেন। কিন্তু সুষ্ঠুভাবে বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় লোকজন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী সকলের সুষম সমন্বয় অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিটি বিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য রয়েছে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি (এসএমসি)। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১১ সদস্যবিশিষ্ট ম্যানেজিং কমিটির(এসএমসি) রূপরেখা, সভাপতি-১ জন, মহিলা সদস্য-১ জন, অন্যান্য সদস্য-৮ জন, সদস্য সচিব-১ জন। সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদাধিকারবলে উক্ত কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব। সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য কর্তৃক উক্ত ম্যানেজিং কমিটি অনুমোদিত হয়ে থাকে। এ কমিটির মেয়াদকাল ২ বছর এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬ মাস পূর্বে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নতুন ম্যানেজিং কমিটি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্ব ও কর্তব্য বহুমূখী। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের ওপর প্রতি বছর মে, আগস্ট ও ডিসেম্বর মাসের ৩০ (ত্রিশ) তারিখের মধ্যে উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার এর নিকট নির্ধারিত ছকে কমিটির সদস্য সচিব ও সভাপতির যৌথ স্বাক্ষরে প্রতিবেদন প্রেরণ করবেন। একই সাথে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি বিদ্যালয় পর্যায়ে ব্যয়িত অর্থের হিসাব অনুমোদন করবে। এসএমসি কর্তৃক খরচের বিষয়টি অনুমোদিত না হলে তা অডিটে গ্রহণযোগ্য হবে না। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিখন-শেখানো পরিবেশ সম্পর্কিত অবস্থা বিশ্লেষণ এবং সমস্যা চিহ্নিত করে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে। এ ক্ষেত্রে তহবিল সংগ্রহ ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্বও তাদের নিকট ন্যস্ত থাকবে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকায় বিদ্যালয় গমনোপযোগী সকল শিশুর বিদ্যালয়ে গমন নিশ্চিতকরণ স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে কমিটি অটিস্টিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু চিহ্নিত করে ভর্তিসহ অন্যান্য কাজে সহযোগিতা প্রদান, তাদের চাহিদা সম্পর্কে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে অবহিতকরণ এবং রেফারেল সার্ভিস প্রদানে সহযোগিতা প্রদান করবে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির পাঠদান কার্য তদারকীকরণ; শিখন-শেখানো সামগ্রী তৈরি/ক্রয়ে সহায়তা প্রদান এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালনার জন্য প্রাপ্ত তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ স্কুল ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্ব। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় প্রাথমিক শিক্ষার দ্বিতীয় সুযোগ কার্যক্রমে ক্যাচমেন্ট এলাকার সংশ্লিষ্ট শিশু ও অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধকরণ এবং কার্যক্রম পরিচালনায় শিক্ষক নির্বাচনে প্রয়োজনীয় সহায়তাদানে সরকার কর্তৃক প্রণীত নির্দেশিকা অনুযায়ী স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি কাজ করতে পারে। প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে শিক্ষক নির্বাচনসহ সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের সাব-ক্লাস্টার ট্রেনিং এবং একাডেমিক তত্ত্বাবধান ও পরিদর্শনে সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসারকে সহযোগিতা প্রদান করতে পারে। দুর্যোগকালীন সময়ে অভিভাবক, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীদের সতর্কীকরণ, প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, দুর্যোগকালীন ও পরবর্তী সময়ের করণীয় নির্ধারণসহ দুর্যোগকালীন পাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য স্কুল ম্যানেজিং কমিটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও শিক্ষক প্রতিনিধি ব্যতীত অন্য নয়জন সদস্য পর্যায়ক্রমে বিদ্যালয় চলাকালীন সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। এ ক্ষেত্রে তারা শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার মান ও পরিবেশের বিষয়ে রিপোর্ট তৈরি করবেন এবং প্রতি মাসে নির্ধারিত বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও পূর্ববর্তী মাসের সিদ্ধান্ত/সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন।

অন্যান্য আরো অনেক দায়িত্বের মধ্যে রয়েছ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা। যেমন- বিদ্যালয় গৃহ, রাস্তা নির্মান, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা সহ অন্যান কাজে সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করা। বিদ্যালয় গমন উপযোগী সকল শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি, উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয় হতে চলে যাওয়া শিশুদেরফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ গ্রহন, ঝরে পড়া রোধ করাও এসএমসি’র সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নয়নে জমি, রাস্তা, খেলার মাঠ এবং বৃক্ষ রোপন ও তা পরিচর্যা করা। পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষা উপকরন সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিতরণ করবেন। বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপন, পুরুস্কার বিতরণী, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, মিলাদ মাহফিল ইত্যাদি কার্যক্রমআয়োজন ও সম্পাদনে সহযোগিতা প্রদান করা। শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি কর্মসুচি বাস্তবায়নে সহযোগিতা প্রদান করা। শিক্ষক-অভিভাবক সমিতির (পিটিএ) সঙ্গে সংযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এছাড়াও সরকার কর্তৃক অর্পিত অন্য যে কোন দায়িত্ব পালন করা।

বাংলাদেশের সঙ্গে জাপান, ফিনল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বিদ্যালয় পরিচালনা সম্পর্কে একটি তুলনামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, জাপান, ফিনল্যান্ড ও ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য নির্ধারণ এবং শিক্ষকদের নিয়োগপদ্ধতি, বেতন ও মর্যাদা কম। জাপান ও ফিনল্যান্ডে শিক্ষার উদ্দেশ্য যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন সদস্য নিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়।বাংলাদেশ ও জাপানে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যসংখ্যা প্রায় একই হলেও সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়া আলাদা। আবার বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামে যোগ্যতাসম্পন্ন সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রভাব থাকে। এ জন্য ফিনল্যান্ড ও জাপানের মতো বাংলাদেশেও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য বাছাই করারব্যবস্থা এবং পরিচালনা কমিটি উন্নত করার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় উপর গুরুত্ব আরোপ করা যেতে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে স্নাতকোত্তর করাসহকমিটির কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরশিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির কর্তৃক ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সত্যনিষ্ঠা ও নৈতিক শিক্ষা প্রদানের বিষয়ে কমিটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি বিদ্যালয়ে ‘চাইল্ড ইন্টিগ্রিটি ও শিশু বঙ্গবন্ধু ফোরাম’ প্রতিষ্ঠা ও ফোরামের যথাযথ তত্ত্বাবধান করতে পারে। কমিটির সকল সদস্য প্রতি মাসের শেষ কর্মদিবসে বা নিকটবর্তী দিবসের পাঠদান কর্মসূচির পরে অন্তত এক ঘণ্টা ছাত্র-ছাত্রীদের অভিযোগ/সুপারিশ শ্রবণপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে মা সমাবেশ ও উঠান বৈঠকের আয়োজন করা। এ দুটি সমাবেশে শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে মতবিনিময়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সমস্যা চিহ্নিত করে তা দূরীকরণ ও সংশোধনে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। শিক্ষার্থীরা যাতে বাড়িতেও নিয়মিত পড়ালেখা করে এবং ছুটির দিনগুলোয় বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যানমূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে, সে সম্পর্কে উপদেশ প্রদান করতে পারে।

শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম স্তর প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষার টেকসই ভিত্তি তৈরি তথা গুণগত মান বৃদ্ধিই একটি শিক্ষিত জাতি বিনির্মাণের অন্যতম পূর্বশর্ত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান পরিবর্তনে যেমন শিক্ষক, অভিভাবক ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা রয়েছে, একই সঙ্গে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি।

লেখক: উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ সাসেক্স হতে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন এন্ড লজিস্টিকস ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর।

 


আব্দুল জলিল ০৯-০৯-২০২৩ ০৬:০৫ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 2366 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com