জাহিদ হাসান সিদ্দিকী একজন মানবিক ইউএনওঃ যে কর্মজালে তিনি অনন্য
০৫ মে, ২০২৬ ০৯:২২ অপরাহ্ন

  

জাহিদ হাসান সিদ্দিকী একজন মানবিক ইউএনওঃ যে কর্মজালে তিনি অনন্য

আব্দুল জলিল
১৯-০৮-২০২২ ০৬:১৫ অপরাহ্ন
জাহিদ হাসান সিদ্দিকী একজন মানবিক ইউএনওঃ যে কর্মজালে তিনি অনন্য

ড. সাজিদ সাজ্জাদ

বাংলাদেশের ৮ টি বিভাগের ৬৪টি জেলায় ৪৯২টি উপজেলা রয়েছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর উপজেলা একটি নদী  ভাঙ্গন কবলিত জনপদ । জেলা সদর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার উত্তরে প্রমত্তা যমুনা নদীর তীরে এই ঐতিহ্যবাহী কাজিপুর উপজেলার অবস্থান। ১৮৭২ সালে এই অঞ্চলে প্রবল ভূমিকম্পের ফলে চর এলাকায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়।  চরাঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থা ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে জমিদার জাহ্নবী রাণী চৌধুরীর পরামর্শে  কাজিপুর কাচারী বাড়িতে “কাজী অফিস” নামে একটি বিচারালয় গড়ে ওঠে। নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলোর ব্যক্তি মালিকানা দেওয়ার লক্ষ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সেটেলমেন্ট এ্যাক্ট  অনুযায়ী ১৯১৮ সালে বিভিন্ন জরীপ কার্য চালানো হয়। এই কাজী অফিস বা শালিসি অফিস বিচারালয়ের  নাম অনুসারে থানার নামকরণ হয় কাজিপুর । ১৯৮৩ সালে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের আওতায়  কাজিপুর উপজেলায় উন্নীত হয়। এখানকার বেশিরভাগ মানুষকে প্রমত্তা যমুনার সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে আগামী দিনে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে হয়। বাংলাদেশের নদী বিধৌত কাজিপুর উপজেলার আয়তন ৩২৮.১৫ বর্গ কিলোমিটার। ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত সিরাজগঞ্জ জেলার ১ নং উপজেলা হচ্ছে কাজিপুর উপজেলা। এখানে ১টি পৌরসভা রয়েছে। এই উপজেলাটি ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। যেমন সোনামুখী, চালিতাডাঙ্গা, গান্ধাইল, শুবগাছা, কাজিপুর, মাইজবাড়ী, খাসরাজবাড়ী, চরগিরিশ, নাটুয়ারপাড়া, তেকানী, নিশ্চিন্তপুর এবং মনসুরনগর। এগুলোর মধ্যে ৬টি ইউনিয়ন (খাসরাজবাড়ী, চরগিরিশ, নাটুয়ারপাড়া, তেকানী, নিশ্চিন্তপুর এবং মনসুরনগর) বন্যা

একজন জনবান্ধব উপজেলা নির্বাহী অফিসার

 

ও ভাঙ্গনকবলিত চরাঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। অত্র উপজেলায় মৌজার সংখ্যা ১১৫টি। ১৯৮টি/২০২টি গ্রাম রয়েছে। মোট জনসংখ্যা প্রায় ২,৮৫,৩০৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১,৪০,২১৩ জন এবং মহিলা ১,৪৫,০৯৬ জন। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ৮৩৫ জন মানুষ বসবাস করে। শিক্ষার হার ৪৫.৭%। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নেহাত কম নয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় ২৩৩টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৫২টি (১টি সরকারি, নিম্ন মাধ্যমিক ১১টি, মাধ্যমিক ৪০টি এবং কলেজ ১৩টি (২টি  সরকারি কলেজ)। কারিগরী কলেজ ৪টি, ফাজিল মাদ্রাসা ১টি, দাখিল মাদ্রাসা ১০টি, কারিগরী স্কুল ৬টি, কে.জি. স্কুল ৪৯টি, আদর্শ গ্রাম ৮টি। এর মধ্যে ৬টি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। হাট-বাজার ১৩টি, সরকারি খাদ্যগুদাম ৪টি, কমিউনিটি ক্লিনিক ৩৫টি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১টি এবং ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৪২২জন। অত্র  উপজেলায় ০৮/০৮/১৯৮৩ থেকে এ যাবৎ ৩৩ জন উপজেলা  নির্বাহী অফিসার  দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে মোঃ জাহিদ হাসান সিদ্দিকী স্যার একটু ব্যতিক্রম। জনাব মোঃ জাহিদ হাসান সিদ্দিকী ১৯৮৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নওগা সদর উপজেলার চকপ্রসাদপুর গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিাবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মোঃ সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী এবং মাতার নাম মোছাঃ আফরোজা বেগম। তিনি নওগাঁ জেলা স্কুল থেকে এস.এস.সি. এবং নওগাঁ সরকারি কলেজ থেকে এইচ. এস. সি. পাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকর্ম বিভাগে ২০০৩-০৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়ে ২০০৭ সালে অনার্স এবং ২০০৮ সালে এস.এস.এস. (মাস্টার্স) ডিগ্রি অর্জন

 

করেন। ৩১তম বিসিএস-এর মাধ্যমে (প্রশাসন) ক্যাডারে সহকারী কশিনার হিসেবে ১৫/০১/২০১৩ খ্রিস্টাব্দে যোগদান করেন।

রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার দায়িত্ব সঠিকভাবে শেষ করার পর তাঁর পদায়ন হয় রাজশাহী ডিসি অফিসে । তারপর পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলায় প্রথম সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তা সূচারুরুপে সম্পন্ন করে  আবারও রাজশাহী জেলার পুঠিয়া উপজেলায় একই পদে অর্থাৎ সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দ্বিতীয় বারের মত যোগদান করেন। সর্বশেষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এঁর ঘনিষ্ঠ সহচর, জাতীয় চার নেতার অন্যতম এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অহংকার ক্যাপ্টেন এম.মনসুর আলীর স্মৃতিবিজড়িত জন্মস্থান নদী বিধৌত কাজিপুর উপজেলায় ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর  ৩৩ তম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে সরকারের এই ভদ্র, ন¤্র এবং চৌকষ কর্মকর্তা যোগদান করেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে প্রথম দিকে ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী সাহেবের সুযোগ্যপুত্র, সিরাজগঞ্জ-১ কাজিপুর আসনের মাননীয় সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক স্বরাষ্ট্র, ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ও পরবর্তীতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং কাজিপুরের নয়নমনি জননেতা আলহাজ্ব মোহাম্মদ নাসিম এমপি’র সাথে কাজ করার সুযোগ পান জনাব মোঃ জাহিদ হাসান সিদ্দিকী। শুরুতেই তিনি নাসিম সাহেবের সব মেগা প্রকল্পগুলোর দেখভাল করা শুরু করেন  এবং এ সংক্রান্ত বহুমুখী জটিলতা দূর করেন। এসময় শহীদ মনসুর আলী ইকোপার্ক ও নদীবন্দর এর অফিস ওয়ার্কগুলো সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি নাসিম সাহেবের নির্দেশমত হাট-বাজারের উন্নয়নে কাজ শুরু করেন। অত্র উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর অনুপস্থিতিতে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে অবৈধভাবে দখলে রাখা অনেক সরকারি জমি উদ্ধার করেন। এছাড়াও জনগণের মাঝে তাদের বাপ-দাদার আমলের জমি দখল ও বেদখল নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটান তিনি নিজ দায়িত্বে। এজন্য তাকে অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে দমে যান নি।   সোনামুখীতে প্রায় ১ একর জায়গা উদ্ধার করেন যার বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। হাটের ড্রেনেজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করেন। এর ফলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার অবসান হয়। এভাবে তিনি মাথাইলচাপড়, সোনামুখী, কালিকাপুর, ভানুডাঙ্গা হাটের সংস্কার করেন। এসব হাটে প্রায় দেড়শ দোকানীকে  বিনামূল্যে দোকানঘর বরাদ্দ দেন। তিনি কাঁচিহারা ও লক্ষ্মীপুর বিলের প্রায় ১২০০-১৫০০ বিঘা ফসলি জমির জলাবদ্ধতা দূর করেন। এছাড়াও জলাবদ্ধতার কারণে মিরারপাড়া এবং পারলকান্দি গ্রামের প্রায় ৩০০-৪০০ বিঘা  অনাবাদী জমির জলাবদ্ধতা দূর করে সেগুলোকে চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসেন। আলহাজ্ব মোহাম্মদ নাসিম এমপি মহোদয়ের মৃত্যুর পর তার পুত্র প্রকৗশলী জনাব তানভীর শাকিল জয় অত্র উপজেলার মাননীয় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।  তারুণ্যের  অহংকার এই তরুণ উদ্দীয়মান নেতার সাথেও তিনি সমানতালে কাজ করেছেন। তিনি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ব্যক্তি এই জন্য যে, তিনি দুই প্রজন্মের দুই জননেতার সাথে কাজিপুবাসীর উন্নয়নে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। এতে তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে তেমনি কাজিপুরবাসী পেয়েছিল একজন জনবান্ধব সরকারি কর্মকর্তা। কাজিপুর একটি পুরনো উপজেলা। মোঃ জাহিদ হাসান সিদ্দিকী স্যারের যোগদানের পূর্বে ইউএনও সম্পর্কে এই উপজেলার মানুষের তেমন কোন স্বচ্ছ ধারণা ছিলনা। এখানে শিক্ষার হার ১০০% না হওয়ায় এখানকার অধিবাসীদের বড় একটি অংশ যেমন নিরক্ষর তেমনি তাদের অধিকার সম্পর্কে খুব একটা সচেতন নয়। এমন কি একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাজকর্ম বা দায়িত্ব সম্পর্কেও তারা খুব একটা মাথাও ঘামাত না এবং জানতও না।

 এ অঞ্চলের মানুষ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দায়িত্ব সম্পর্কে মোটামোটি অবগত হয়েছে বিদায়ী ইউএনও জনাব মোঃ জাহিদ হাসান সিদ্দিকী মহোদয়ের ঐকান্তিক সহযোগিতায়। ইউএনও মহোদয় একদিন বিকেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত কাজিপুর উপজেলার শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময়কালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসেল চত্ত্বরে বসে নিজের বর্তমান অবস্থানে আসার পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে একজন ইউএনওর কী কী দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে তা উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাখ্যা করছিলেন। তিনি যেমন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর ছিলেন তেমনি অসহায় ও দুস্থ মানুষের সেবা করার জন্য তাদের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন। কখনও একা আবার কখনও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে নিয়ে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করতেন। তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রের মানষকন্যা শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফসল আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজগুলো  সঠিকভাবে তদারকি করে কাজিপুর উপজেলার অনেক গৃহহীন মানুষকে নিরাপদে বসবাসের জন্য ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এতে করে প্রকৃত অসহায় ও গৃহহীন মানুষগুলো বসবাসের জন্য  একটি করে ঘর পেয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় কাজিপুর উপজেলায় ৩৪২টি ঘরের মধ্যে ২০২টি ঘর নির্মাণ শেষে প্রকৃত গৃহহীনদেরকে হস্তান্তর করা হয়েছে। অবশিষ্ট ১৪০টি ঘরের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। মাইজবাড়ী ইউনিয়নের বিলচতল ও বেলতৈল গ্রামে, সোনামুখী ইউনিয়নের উত্তর পাইকপাড়া, পাঁচগাছি, সোনামুখী পূর্বপাড়া, হাজরাহাটি ও রৌহাবাড়ি গ্রামে, চালিতাডাঙ্গা ইউনিয়নের চালিতাডাঙ্গা, হিন্দুপাড়া, ভানুডাঙ্গা কালিমন্দির, ভানুডাঙ্গা শ্মশান, ভানুডাঙ্গা হাট, চর ভানুডাঙ্গা, চর ভানুডাঙ্গা চাতাল, চরভানুডাঙ্গা বিলপাড়া এবং লক্ষ্মীপুর গ্রামে,  কাজিপুর ইউনিয়নের মেঘাই-১, মেঘাই-২ এবং মেঘাই-৩, গান্ধাইল ইউনিয়নের হাসপাতালের নিকট, চরগিরিশ ইউনিয়নের সিন্দুরপাড়া গ্রামে এবং চর তেকানি ইউনিয়নের কেনারবেড়-১ ও কেনারবেড়-২ গ্রামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়। তিনি আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শনকালে সেখানে অবস্থানরত অসহায় মানুষদের সাথে কথা বলে তাদের সুখ-দুঃখের কথা জানার চেষ্টা করার পাশাপাশি তাদের ছোট-খাট সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেছেন। এছাড়াও সোনামুখী ইউনিয়নের কৃষ্ণগোবিন্দপুর গ্রামে এবং চরতেকানি ইউনিয়নে একটি করে গুচ্ছ গ্রাম নির্মাণ করা হয় এই জনবান্ধব ইউএনও মহোদয়ের সময়। ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া ‘করোনা’ নামক ভয়াবহ ভাইরাসের ঢেউ সারাদেশের মত কাজিপুর উপজেলাতেও আছড়ে পড়েছিল। মানুষ কাজ করার জন্য বাইরে যেতে পারত না। সন্তান তার বাবার সাথে দেখা করত না। এমনকি করোনা আক্রান্ত রোগী মারা গেলে তার জানাযায় লোক খুঁজে পাওয়া যেত না। মানুষের মাঝে অজানা এক মৃত্যু আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিদায়ী  ইউএনও  মহোদয় প্রতিটি গ্রামে গিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে  মানুষকে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। করোনা রোগে টিকার ব্যবহারে তার অনুপ্রেরণামুলক  অবদান রয়েছে। তিনি কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে প্রথম করোনা টিকা গ্রহণ করেন যাতে মানুষের মাঝে করোনার টিকা নিয়ে বিভ্রান্তি দূর হয়। নিজের কথা ভাবেন নি। তিনি এই কাজ করতে গিয়ে দুই দুইবার করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবুও তিনি তার দায়িত্ব থেকে সরে দাাঁড়ান নি। তিনি করোনাকালীন সময়ে  সমাজের বিত্তবান মানুষের কাছে  আবেদন জানিয়েছিলেন একটি ফান্ড গঠনের জন্য, যেখান থেকে  করোনায় আক্রান্ত মানুষ এবং কাজের সন্ধানে যেতে না পারা মানুষদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা কথা বলা হয়। বিত্তবান মানুষ তার কথায় সাঁড়া দিয়ে প্রায় ৫লক্ষ টাকা ফান্ডে জমা দেন। তিনি উক্ত টাকা গরীব, অসহায় ও দুঃস্থ মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেন। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার একজন নবীন সৈনিক হিসেবে বিশ্বাস করেন বর্তমান সভ্যতায় টিকে থাকতে হলে ডিজিটালাইজ না হওয়ার কোন বিকল্প নেই। বর্তমান যুগে মানুষের যোগাযোগের সবচেয়ে  শক্তিশালী মাধ্যম হচ্ছে  মোবাইল ফোন। উপজেলার মানুষের বহুমুখী সমস্যা জানা এবং তা আন্তরিকতার সাথে সমাধানের জন্য নিজের মোবাইল ফোনের নাম্বারটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন রিক্সাওয়ালাও এখন ইউএনও মহোদয়ের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলতে পারেন। তার এলাকার সমস্যার কথা জানাতে পারেন। তিনি একজন নিরহংকারী মানুষ। তার চাহিদা খুবই সামান্য। তিনি তার দায়িত্ব পালনকালে অন্যায়ের সাথে আপোষহীন ছিলেন। এজন্য তাকে ১বছর আগে বদলী করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। কিন্তু মাননীয় এমপি মহোদয়ের আন্তরিকতায় তাঁর বদলীর ওর্ডার বাতিল করা হয়। তিনি একজন শিক্ষানুরাগী মানুষ। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পথচলা “উপজেলা পরিষদ আদর্শ একাডেমী, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ” নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে যেখানে উপজেলার শিক্ষানুরাগী মানুষেরা তাদের সন্তানদের পড়াশুনার জন্য পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন। এই প্রতিষ্ঠানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমোদনের ব্যবস্থা করেছেন তিনি।

 

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তিনি যোগ্যতা সম্পন্ন কিছু উদীয়মান কর্মদ্যোগী এবং শিক্ষানুরাগী তরুণকে শিক্ষক হিসেবে উক্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করেছেন। এতে যেমন কিছু বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে তেমনি কিছু পরিবার আলোর সন্ধান পেয়েছে। তাঁর স্বপ্ন কাজিপুর উপজেলার বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের  সন্তানেরা যাতে একটি মান-সম্মত স্কুলে পড়াশুনা চালিয়ে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার একজন চৌকষ ও দক্ষ সৈনিক হতে পারে। সাম্প্রতিককালে উক্ত প্রতিষ্ঠানটির জন্য এমপি মহোদয় একটি আধুনিক স্কুল ভবন নির্মানের জন্য ৮৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ  দিয়েছেন যা শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি যেমন সদা মিষ্টভাষী মানুষ তেমনি ন্যায় নীতির দিক থেকে অনেকের অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হন। তিনি অত্র উপজেলায়  মাদক নিরাময়ের ক্ষেত্রে  অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বিভিন্ন মাদক পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে মাদকসেবীদের ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে শাস্তি বিধান করে মাদক নিরাময়ে কাজ করেছেন। তিনি উপজেলার বিভিন্ন হাটে ও বাজারের বিভিন্ন দোকানে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে অত্র উপজেলার মানুষের ভেজালমুক্ত খাবার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি ওষুধের দোকানে  অভিযান চালিয়ে ওষুধ ব্যবসায়ীদেরকে প্রথমে সতর্ক  এবং পরে আইন না মানলে শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন। তিনি উপজেলার প্রমত্তা যমুন নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারী বালু মহালদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছেন। চরাঞ্চলের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হঠাৎ সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে দায়িত্বে অবহেলার দায়ে কর্মকর্তা- কর্মচারীদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে এসেছেন। এতে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা অনেক খানি কমে গেছে। তিনি কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে ফসলের বীজ বিতরণ করেছেন। কৃষকরা যাতে তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পায় সে জন্য তিনি নিজে গ্রামে এবং হাটে-বাজারে ঘুরে ঘুরে প্রকৃত কৃষককে তার হাতে টোকেন পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি শীতকালে তীব্র শীতের মাঝে রাতের আঁধারে অসহায় ও শীতার্ত মানুষের মাঝে গরম কাপড় বা কম্বল বিতরণ করেছেন। তিনি নিজে রাতে ঘুমানোর কথা না ভেবে তার দায়িত্বের কথা বেশি প্রধান্য দিয়েছেন। শুক্রবারেও বাড়িতে আরাম না নিয়ে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন এলাকায় সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড দেখার জন্য। তিনি বৃদ্ধ ও শিশুদেরকে খুব বেশি ভালোবাসতেন এবং তাদের প্রতি কোন অবহেলা তিনি সহ্য করতেন না। তিনি একবার রাস্তায় ফেলে যাওয়া একজন অসুস্থ বৃদ্ধকে উপজেলা  স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং চিকিৎসা শেষে তার পরিবারের হাতে তাকে তুলে দেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ক্যান্সার আক্রান্ত একজন শিক্ষার্থীকে তিনি চিকিৎসা বাবদ এককালীন ১০ হাজার টাকা প্রদান করেন। তিনি তার অফিসে কর্মরত স্টাফদের সাথে সব সময় সন্তোষজনক আচরণ করতেন। ফলে তিনি একজন প্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি সামাজিক সচেতনতা জাগরণের জন্য বাল্যবিয়ে বন্ধ করার জন্য ব্যাপক অভিযান চালিয়ে ছিলেন। অনেক বাল্য বিয়ে বন্ধ করে বাল্যবিয়ের সাথে জড়িতদের শাস্তির আওতায় নিয়ে এসেছেন। তিনি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ধারণা রাখতেন। তাই তিনি কাজিপুরের পরিবেশ রক্ষায় চরাঞ্ছলসহ বিভিন্ন জায়গায় বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা করেন। এতে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাকে সানন্দে সহযোগিতা করেছেন। তিনি বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা এবং মুক্তিযোদ্ধা ভাতা প্রকৃত ব্যক্তিরা যাতে পায় সেজন্য গোপনে তদন্ত করেছেন। তিনি নিজ দায়িত্বে অনেকের ভাঙ্গা সংসার দুপক্ষকে বুঝিয়ে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছেন। রাস্তা সংস্কারের ক্ষেত্রে অনেক অনিয়ম ছিল। অনেকে কাজ করেও সময়মত মজুরি পেত না। কিন্ত ইউএনও মহোদয়ের হস্তক্ষেপে তা দূর হয়। তিনি যমুনা নদীতে নৌ-ডাকাতি ঠেকাতে রাতে নদীতে টহল জোরদারে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিতেন। তিনি অনেক ইউনিয়ন পরিষদের অসৎ সদস্যকে অনিয়মের দায়ে শাস্তির আওতায় নিয়ে এসে জনগণের আস্থাভাজন হন। কাজিপুরের হাটে-বাজারে, কবরস্থানে, মসজিদ ও মন্দিরের সামনে এবং জনসমাগম হয় এমন স্থানে সোলার লাইটের ব্যবস্থা তাঁরই আন্তরিক প্রচেষ্টার ফল। আজকে কাজিপুর উপজেলা ভূমি অফিস ডিজিটালাইজ হয়েছে। এতেও ইউএনও মহোদয়ের বড় অবদান রয়েছে। বর্তমান ইউএনওর সময়ে কাজিপুর উপজেলা প্রশাসন প্রথম বারের মত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অনন্য অবদান রাখায় দশ গ্রাম পুলিশকে ক্রেস্ট ও সনদ প্রদান করেছে যা ইউনিয়ন পর্যায়ে কাজের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে। উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তাদের সাথেও তিনি একটি সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। ফলে উপরিউক্ত কাজগুলো সম্পাদন করা তাঁর জন্য অনেক সহজতর হয়েছে। শেষ কথা, ইউএনও মহোদয় উন্নয়নকর্মকান্ডে সকলকে একটি প্লাটফর্মে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন বলেই তিনি যেমন প্রয়াত জননেতা আলহাজ্ব মোহাম্মদ নাসিম এবং তার পুত্র বর্তমান কাজিপুরের সাংসদ প্রকৌশলী জনাব তানভীর শাকিল জয় মহোদয়ের ¯েœহভাজন হয়েছিলেন খুবই স্বল্প সময়ে তেমনি তাঁর জনবান্ধব কাজের জন্য কাজিপুরবাসীর কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেবেন হাজার বছর। উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের এমনিই ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া উচিৎ। তবেই দেশ ও দেশের মানুষের পথাচলা হবে আনন্দমুখর যা সকল সুনাগরিকের অন্তরাত্মার একমাত্র প্রত্যাশা। একটি দেশ ও জনগণের বাঞ্ছিত উন্নয়নের জন্য সরকার পুরো শাসন ব্যবস্থাকে কয়েকটি স্তরে বিভক্ত করেন। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তৃণমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত কিছু চৌকষ ব্যক্তিবিশেষের দক্ষ পরিচালনায় একটি দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড যেমন ত্বরান্বিত হয় তেমনি কিছু অসৎ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত উন্নয়নের চাপে জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। জনগণ  বঞ্চিত হয় তাদের ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তি থেকে। বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থায় পর্যায়ক্রমে প্রথমে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ, সচিব, এমপি, ডিসি এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। উপরিউক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে জনগণের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। এই অফিসার খুব কাছ থেকে তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের সুখ-দুঃখ উপলব্ধি করতে সক্ষম। কারণ ঘুম ভেঙ্গে অফিসে বসতেই ইউএনও মহোদয়ের সামনে হাজির হন প্রত্যন্ত গ্রামের সমস্যাগ্রস্ত মানুষগুলো। সারাদিন চলে তাদের সঙ্গে ইউএনও মহোদয়ের নানা বিষয়ের কথোপকথন। কখনও হয়ত দুপুরের খাবার  খাওয়া হত না। আবার কখনও হলেও তা বিকেল ৪-৫টা বেজে যেত। গত ২০/০৭/২০২২ খ্রি. তারিখে এই সদালাপী মানবিকগুণের অধিকারী মানুষটির বদলীর অর্ডার প্রজ্ঞাপণ আকারে প্রকাশ  পায়। ৩ বছর ৯ মাস ১০ দিন  অর্থাৎ (১,৪০০দিন) এই উপজেলায় তার পদচারণা স্মৃতি হয়ে রবে এই উপজেলাবাসীর মনে। তিনি গাইবান্ধা জেলার এডিসি হিসেবে যোগদান করবেন। কাজিপুর উপজেলার একজন অধিবাসী হিসেবে স্যারের প্রতি রইল শুভ কামনা আর অকৃত্রিম ভালোবাসা। ইউএনও যাবে আরেকজন ইউএনও আসবে। শুধু মানবিকগুণগুলো মানুষকে মানুষের মাঝে বাঁচিয়ে রাখবে হাজার বছর। যেখানেই থাকুন ন্যায়-নীতির বাহন হয়ে মানুষের মাঝে মানবিক গুণ ফুটিয়ে তুলে সত্যকে ধারণ করুন এবং ধারণ করান-এইটুকুই চাওয়া। কাজিপুরবাসী  আপনাকে আজীবন মনে রাখবে একজন জনবান্ধব উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে

 -আপনাকে স্যালুট।

লেখকঃঃ

নাট্যকার, থিয়েটারকর্র্মী ,আর.এস.এল এবং শিক্ষক, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, শালবাগান, রাজশাহী।


আব্দুল জলিল ১৯-০৮-২০২২ ০৬:১৫ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 584 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com