সাখাওয়াত হোসেন -এক আলোকিত বাতিঘর
২২ এপ্রিল, ২০২৬ ০১:৫৩ অপরাহ্ন

  

সাখাওয়াত হোসেন -এক আলোকিত বাতিঘর

আব্দুল জলিল
১৫-০৭-২০২১ ১২:৫১ অপরাহ্ন
সাখাওয়াত হোসেন -এক আলোকিত বাতিঘর

 সেই ধন্য নরকূলে /লোকে যারে নাহি ভুলে। মনের মন্দিরে নিত্য/ সেবিছে সর্বজন

 এই পৃথিবীতে সৃষ্টির সেই আদিকাল থেকে কিছু মানুষ জন্মায় মানুষের উপকারের জন্যেই। নিজের প্রতি যেটুকু খেয়াল রাখার দরকার ঠিক ততটুকু মানুষের জন্যেও তারা কাজ করে যান। পৃথিবীতে এই শ্রেণির মানুষের সংখ্যা অবশ্য দিন দিন কমে যাচ্ছে। তারপরেও কিছু মানুষ এখনো মানবতার বাতি জ্বালিয়ে নিজের আমলনামা দেখেন। নিজের ভালো চেতনা অন্যের সাথে মানিয়ে নেন। মানুষের জন্যে কিছু করার চেতনা তাকে ঠিকমতো ঘুমাতে দেয় না। এমনই একজন স্বপ্নবাজ  মানুষ সাখাওয়াত হোসেন। পেশায় প্রকৌশলী। কিন্তু মনটার বিচরণ যান্ত্রিকতার বাইরে। তাইতো সুযোগ পেলেই দেশের বাইরে ঘুরতে বেরোন। কিছু সময় বের করে ছোটেন নৈস্বর্গিক আনন্দের খোঁজে পথ থেকে পথে। অবশ্য এই আনন্দের মাত্রা আরো বেড়ে যায় যখন তিনি এই ছোটাছুটির মধ্যে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে মানুষের উপকারে ব্যয় করেন। তিনি কালেরকণ্ঠের শুভসংঘের কাজিপুর উপজেলা কমিটির একজন উপদেষ্টা।

 

তার জন্মস্থান কাজিপুরের ছিন্নমূল অসহায় মানুষ, দরিদ্র অথচ মেধাবী শিক্ষার্থী, কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা, রোগে চিকিৎসাহীন রোগী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, নদী ভাঙ্গনে নিঃস্ব-রিক্ত মানুষ অথবা গৃহহীন মানুষের পাশে সহায়তার হাত বাড়ানো মানুষটির নাম প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন। উত্তর সিরাজগঞ্জের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভয়েস অব কাজিপুরের তিনি সভাপতি। ২০১২ সাল থেকে এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি সামাজিক মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। সহায়তার শুরুটা অবশ্য এর আগে থেকেই।

 প্রচারবিমুখ মানবতার ফেরীওয়ালা প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার শুভগাছা ইউনিয়নের দোয়েল গ্রামের মরহুম আজিজুর রহমান সরকারের কনিষ্ঠ পুত্র। গ্রামের স্কুলের পাঠ শেষে ১৯৯৩ সালে রাজশাহী সরকারী কলেজ থেকে উচ্চ

মাধ্যমিক শেষ করেন। এরপর বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি-এস.সি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি হংকং ভিত্তিক একটি বহুজাতিক কোম্পানি শেলসাম ট্রেডিং লিমিটেড এর কান্ট্রি ম্যানেজার। পাশাপাশি নিজের কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করছেন।

 চোখের সামনে যমুনার ভাঙ্গনে নিজের গ্রাম হারিয়ে যেতে দেখেছেন সাখাওয়াত হোসেন। ভাঙনের সেই দুঃসহ স্মৃতি তাড়িত হয়ে তিনি ২০১৩ সালে উপজেলার গান্ধাইলে জমি কিনে যমুনায় সর্বস্ব হারানো মানুষদের জন্যে গড়ে তুলেছেন একটি গুচ্ছগ্রাম। বর্তমানে সেখানে ৫০ টি পরিবার নিরাপদে বসবাস করছে। গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের সুপেয় পানির কষ্ট নিরসনে স্থাপন করেছেন নলকূপ। বছরের দুই ঈদে তাদের ঈদ সামগ্রী প্রদান করেন। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার নিয়মিত খোঁজ রাখেন তিনি।

একই সময়ে নিজ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও ভাঙনের কবলে পড়ে। স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রয়োজনীয় জায়গা যখন কোথাও পাচ্ছিলেন না তখন তিনি সহায়তার হাত বাড়ালেন। নিজে ২২ শতক জমি কিনে ওই বিদ্যালয়ের নামে দলিল করে দেন। নতুন জায়গায় স্থানান্তরিত হয় দোয়েল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

 কাজিপুরের কর্মক্ষম অথচ ভবঘুরে এবং অস্বচ্ছল, পঙ্গু লোকদের জন্যে তিনি গড়ে দিয়েছেন টং দোকান। দোকান শুরুর প্রাথমিক চালানটিও তিনি দেন। এভাবে একসময়ের শতাধিক ভিক্ষার হাত কর্মের হাতে পরিণত হয়েছে।

তারই প্রচেষ্টায় সিমান্তবাজারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কাজিপুরের সর্ববৃহৎ ‘বাংলাবাজার মার্কাস মসজিদ’। এই মসজিদের সিংহভাগ অর্থ দান করেছেন প্রচারবিমুখ এই মানুষটি।

নিজ গ্রামের মানুষের জন্য একটি কবরস্থানের জায়গা দান করেছেন এই দানবীর।

 

 ‘ভয়েস অব কাজিপুর’ এর ব্যানারে প্রতিবছর অসহায় গরীব মানুষদের জন্য দুই ঈদে ঈদসামগ্রী ও নতুন পোষাক, বন্যায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ও জরুরি মেডিকেল ক্যাম্প, নদীভাঙ্গন কবলিত এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদাণ, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, অসহায় শীতার্তদের শীতবস্ত্র বিতরণ, প্রতিবন্ধীদের বিশেষ সহযোগিতা, ঔষধসহ বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন তিনি।

 নির্যাতিত মুসলিম রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা করতে উদার মনের বন্ধুদের নিয়ে গিয়েছিলেন উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।

 প্রতিবছর বন্যাকালিন সময়ে কাজিপুরের দূর্গম চরাঞ্চলের মানুষের  ডাকে সাড়া দিয়ে সহায়তার হাত বাড়ান নিরহংকার সাদা মনের এই মানুষটি। কখনো নৌপথে, কখনো পায়ে হেটে চলেছেন মাইলের পর মাইল, যতদূর পর্যন্ত একজন ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকারের শব্দ শোনা যায় ততদূর পর্যন্ত তার ক্লান্তিহীন ছুটে চলা। বিত্তবান বন্ধু ও পরিচিতদেরকে সামাজিক কাজে আগ্রহী করে তুলতে তার জুড়ি নাই। তাঁর এই অসাধারণ কর্মকাণ্ড দেখে অনেকেই উৎসাহিত হয়ে মানবসেবায় এগিয়ে আসছেন।

 কাজিপুরের কয়েকশ বেকারকে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহযোগিতা করেছেন তিনি। সিএনজি, অটোভ্যান, নৌকা, মুদি দোকান, সেলাই মেশিন কিনে দিয়ে তাদেরকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেছেন।  অনেক বেকারকে তিনি  নিজ প্রতিষ্ঠানে চাকুরী দিয়েছেন। অনেককে তার বন্ধুদের প্রতিষ্ঠানে চাকুরি পেতে সহায়তা করেছেন। এ পর্যন্ত অর্ধশত কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে মেয়ের বিয়ের সমস্ত খরচ দিেেয়ছেন।

 হাজারো সুবিধাবঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়া প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানান, ‘ অন্যের কষ্টকে নিজের করে ভাবতেই ছুটে যাই সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে। চোখের সামনে নিজের গ্রামকে যমুনার পেটে যেতে দেখেছি। সেই কষ্ট থেকে গুচ্ছগ্রাম করে দিয়েছি। এভাবে আমৃত্যু মানুষের পাশে থেকে মানবতার কাজ করে যেতে চাই।’

 


 


আব্দুল জলিল ১৫-০৭-২০২১ ১২:৫১ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 390 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com