মৃত্যুতেও মানুষের নির্মমতার শিকার যে কবি
১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:৩৬ অপরাহ্ন

  

   শিরোনামঃ

মৃত্যুতেও মানুষের নির্মমতার শিকার যে কবি

আব্দুল জলিল
০৯-০৬-২০২১ ০৮:৫০ পূর্বাহ্ন
মৃত্যুতেও মানুষের নির্মমতার শিকার যে কবি
সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে/ সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে..

শৈশবের সেই সোনালী সময়ে ফিরেত পারেননি কখনও। পারেননি কপোতাক্ষের এক ফোটা পানিও পান করতে। পারেননি পিতৃধর্ম সনাতন কিংবা গৃহিত খৃষ্ট ধর্মের কারো নিকট আপন হতে। পারেনি জীবনের প্রাণপ্রাচুর্যের মাঝে নিজেকে ধরে রাখতে। হয়নি তার ইংরেজি কবিতার মূল্যায়ণ। পাননি প্রকৃত কবির মর্যাদা।স্বজাতি, স্বদেশ ত্যাগ করেও যার বিধি ডানের ঘরে যায়নি; অগণন না পারা আর না পাওয়া এমন কবিদের সংখ্যা হয়তো ইতিহাসে বেশি একটা নেই।বাংলা সাহিত্যের হতভাগ্য এই কবির নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

 এমনকি নিজের ধর্ম ত্যাগ করে যে ধর্মের মায়াজালে নিজেকে নিবেদন করলেন সেই ধর্মের প্রধানগণও তার প্রতি চরম অবজ্ঞা আর অবহেলা দেখিয়েছে। এ কারণে র্দীর্ঘ সময় তার লাশও পড়েছিলো হাসপাতালের মর্গে।

প্রবল বিদ্বেষ ও ঈর্ষায় মধুসূদন দত্তের জন্য গোরস্থানে জায়গা ছাড়তে নারাজ ছিল তৎকালীন কলকাতার খ্রিস্টান সমাজ।

চূড়ান্ত ভঙ্গুর স্বাস্থ্য নিয়ে মাইকেল ভর্তি হলেন আলিপুরের হাসপাতালে। সেকালের এই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ছিল কালাপানি পেরনোর সমান। তাঁকে সেখানে ভর্তি করতে যথাসাধ্য করলেন বন্ধু উমেশচন্দ্র ব্যানার্জী। সিরোসিস থেকে তদ্দিনে বিনা চিকিৎসায় দেখা দিয়েছে উদরী আর শরিক হয়েছে হৃদরোগ।

মৃত্যুশয্যায় শায়িত থেকেও তাঁর উদারতা অথবা ধারের স্বভাব যায়নি। তাঁর এককালের মুন্সি মনিরুদ্দিন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন হাসপাতালে। কবির কাছে তাঁর ৪০০ টাকা পাওনা। কবি তাঁকে শুধলেন, তাঁর কাছে এই মুহূর্তে কোনও টাকা পয়সা আছে! কাছে ছিল দেড় টাকা, সেই নিয়ে মধুকবি দিলেন তাঁকে পরিচর্যা করা নার্সটিকে।

হাসপাতালে ছিলেন সব মিলিয়ে সাত-আট দিন। এর মধ্যেই খবর পেলেন, ২৬ জুন, ১৮৭৩ সহধর্মিণী হেনরিয়েটা দেহত্যাগ করেছেন। সেই খবর শুনে ভগ্নস্বাস্থ্য ব্যাকুলচিত্ত মাইকেল আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘বিধাতঃ তুমি একইসঙ্গে আমাদের দুজনকে নিলে না কেন?’

মাদ্রাস থেকে বিদ্রোহ করে হেনরিয়েটা এসেছিলেন কলকাতায়। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি মাইকেলের সঙ্গে আইনত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেননি। একসঙ্গে থাকলেও, সন্তান জন্ম দিলেও, আইনত স্ত্রীর মর্যাদা পাওয়া হয়নি তাঁর। সেই নিয়ে কলকাতার অ্যাংলো তথা খ্রিস্টান সমাজে সেসময় কম জলঘোলা হয়নি।

সহধর্মিণীর আকস্মিক মৃত্যু। দুই পুত্র, বারো বছরের মেঘনাদ এবং ছয় বছরের নেপোলিয়নকে দেখভালের চিন্তা! পত্নীর শেষকৃত্য হবে কী করে! অর্থ আসবে কোথা থেকে! কে-ই বা দায়িত্ব নেবেন! এইসব দুশ্চিন্তার মেঘ তাঁকে অস্থির করে তুলল।

২৮ জুন, মাইকেল বুঝতে পারছেন, একটু একটু করে মৃত্যুর গাঢ় ছায়া তাঁকে ঘিরে ধরছে। কৃষ্ণমোহন সেদিন এসে খ্রিস্টধর্মের আচার অনুযায়ী তাঁর ‘শেষ স্বীকারোক্তি’ বা ‘লাস্ট কনফেশন’ আদায়ের জন্য সঙ্গে লেগে রইলেন। এও বললেন, তাঁর প্রতি অ্যাংলিকান চার্চের মনোভাব বিশেষ সুবিধের নয়, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সমাধির জন্য জমি পেতে গোল বাঁধবে। প্রত্যুত্তরে মাইকেল যা বলেছিলেন তা যে কোনও অবিশ্বাসীর মনেও হিল্লোল তুলতে বাধ্য। তিনি কৃষ্ণমোহনকে জানান,

‘মানুষের তৈরি চার্চের আমি ধার ধারিনে। আমি আমার স্রস্টার কাছে ফিরে যাচ্ছি। তিনিই আমাকে তাঁর সর্বোত্তম বিশ্রাম স্থলে লুকিয়ে রাখবেন।’

২৯শে জুন, দুপুর দুটো। তাঁর চূড়ান্ত ক্লান্ত ক্ষয়িষ্ণু দেহ আর প্রাণ ধরে রাখতে পারল না। চূড়ান্ত অবহেলার পৃথিবী থেকে মধুসূদন দত্ত নিঃশব্দে বিদায় নিলেন।

যে কলকাতার খ্রিস্টান সমাজ তিরিশ বছর আগে তাঁর ধর্মপরিবর্তনকে বিপ্লবের সামিল বলে উন্মাদনার ঢেউ তুলেছিল, তাঁরাই তাঁর শেষ শয়ানের জন্য কয়েক ফুট মাটি ছাড়তে কিছুতেই রাজী হল না। ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকা চূড়ান্ত অবহেলা দেখিয়ে তাঁর মৃত্যুর খবর অবধি ছাপল না।

খ্রিস্টান সমাজের যুক্তিহীন বেপরোয়া আক্রোশের শিকার হয়ে, কলকাতার ভ্যাপসা গরমে ভাগ্যহত মধুকবির মরদেহ পড়ে রইল পূতিগন্ধময় মর্গের অন্দরে, অবহেলায়। কৃষ্ণমোহন ছিলেন কলকাতার ধর্মযাজকদের অন্যতম প্রবীণ সদস্য। তিনি কথা বললেন, কলকাতার লর্ড বিশপ রবার্ট মিলম্যানের সঙ্গে। বিশপ অনুমতি দিলেন না। পরদিনও ওই মর্গের নরকে পড়ে পচতে থাকল মাইকেলের রুগ্ন জীর্ণ একাকী মৃতদেহ।

আসরে নামেন, অ্যাংলিকান চার্চের এক সিনিয়র চ্যাপলেইন। তিনি সেন্ট জেমস চার্চের পাদ্রি। লর্ড বিশপের বিরুদ্ধে কোনও সিদ্ধান্ত নিলে তাঁর পদচ্যুতি-সহ খ্রিস্টান সমাজে নানা লাঞ্ছনার স্বীকার হতে হবে জেনেও তিনি এগিয়ে এলেন। তিনি রেভারেন্ড পিটার জন জার্বো। তাঁর চেষ্টায় ৩০ জুন বিকেলে লোয়ার সার্কুলার রোড বা এখনকার মল্লিকবাজারের সমাধিস্থলে মাইকেলের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয়।

কিন্তু এতো অবজ্ঞা-অবহেলার মধ্যেও মধুকবি প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে আছেন। কারণ মানুষ বাঁচে তার কর্মের মাধ্যমে ধর্ম বা অর্থবিত্তের মাঝে নয়। বাংলা সাহিত্যের অমর সব সৃষ্টি তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে। যারা তার কবরের জায়গাটুকুও দিতে নারাজ আজ তাদের কবরের খবরও কেউ রাখে না, কিন্তু মধুকবির সমাধীতে গিয়ে অনেকেই চোখের জল ফেলে প্রচন্ড আবগে ভালোবাসায়, যা ধর্ম বা অর্থের মাপকাঠিকে পরিমাপযোগ্য নয়।

 


আব্দুল জলিল ০৯-০৬-২০২১ ০৮:৫০ পূর্বাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 713 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com