শিক্ষার প্রকৃত মর্যাদা, প্রকৃত শিক্ষিত ব্যক্তির কাছেই
একজন অশিক্ষিত লোকের কাছে যদি আপনি আপনার শিক্ষার গৌরব প্রকাশ করেন তাহলে সেই ব্যক্তি আপনার উচ্চ শিক্ষাকে কটাক্ষ করতে বিন্দুমাত্র সময় নিবে না, সেটি যে ধরনের শিক্ষাই হোক। কারণ সে অশিক্ষিত, তাই আপনার শিক্ষার মূল্য সে দিতে পারবে না। সেটি হোক স্বশিক্ষা বা হোক বিদ্যাশিক্ষা।
আবার এমন অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিও রয়েছেন এবং তারাও পূর্ণাঙ্গভাবে আপনার শিক্ষার মূল্য দিতে পারবে না। কারণ শিক্ষিত ব্যক্তিও তিন রকম। এক যারা স্বশিক্ষায় শিক্ষিত এবং দ্বিতীয়ত যারা পুস্তকবিদ্যায় শিক্ষিত এবং তৃতীয়ত যারা স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত। এর মধ্যে যারা প্রথমটির আওতায় পড়েন তারা আপনার সামাজিক, চারিত্রিক ও মানবীয় গুণগুলোকে সম্মান করবে বটে তবে আপনার পুস্তকবিদ্যাকে সম্মান করতে পারবে না। আর যারা দ্বিতীয়টির আওতায় পড়েন তারা আপনার পুস্তকবিদ্যাকে সম্মান করবে বটে তবে তারা আপনার সামাজিক, চারিত্রিক ও মানবীয় গুণগুলোকে সম্মান করতে পারবে না। এবার আপনি লেখক কে প্রশ্ন করতেই পারেন যদি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি অথবা পুস্তকবিদ্যায় শিক্ষিত ব্যক্তি প্রকৃত শিক্ষিত না হয় তবে আপনি প্রকৃত শিক্ষিত কাকে বলবেন অথবা আমাকে তৃতীয়টির (স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত ব্যক্তি) ব্যাখ্যা দিতে বলবেন। প্রতিত্তরে আমি বলবো প্রকৃত শিক্ষিত ব্যক্তি তাঁরাই যারা স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত। প্রকৃতপক্ষে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি বা পুস্তকবিদ্যায় শিক্ষিত ব্যক্তি নয় বরং স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত ব্যক্তিই প্রকৃত মর্যাদার অধিকারী। আমি জানি শুধু এইটুকুতে আপনার মন ভরে নাই। আপনি এখনো ভাবছেন যে, আমি কেন স্বশিক্ষায় শিক্ষিত আর স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত এই দু'টি বিষয়কে আলাদা করে দেখছি।
চলুন তাহলে বলছি, স্বশিক্ষায় শিক্ষিত আর স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত কথা দু'টি কেন জানি আমার কাছে ভিন্ন মনে হয়। কেননা আমার মতে, স্বশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি সামাজিক ও চারিত্রিক দৃষ্টিকোণে শিক্ষিত বটে, তবে পুস্তকবিদ্যায় অশিক্ষিত। অপরদিকে স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত ব্যক্তি যেমনভাবে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত, ঠিক তেমনভাবে পুস্তকবিদ্যায় সমান শিক্ষিত। এবার আপনারা প্রশ্ন করে বসতেই পারেন যে, স্বশিক্ষায় শিক্ষিত আর স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত এই দুই ভাগে ভাগ করার কি যৌক্তিকতা আমি আপনাদের দেখাতে পারি। শুনুন তাহলে, কিছুদিন আগেই সুশীল সমাজের সামাজিক, চারিত্রিক ও মানবীয় গুণে সর্বোজ্ঞ এক ব্যক্তির নিকট কেবলই এক যুবক গর্বের সাথে বললো, "আমি ওমুক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এ জেনেটিক্স এ অনার্স করছি।" ওমনি ঐ ভদ্রলোক সেই যুবক কে বলে বসলেন, এ আর এমন কি? আমার ছেলেও তো ওমুক কলেজে পৌরনীতিতে অনার্স করছে। এখন এগুলো কোনো ব্যাপার না। এবার আপনিই বলুন ভদ্রলোকের এই কথাগুলোতে সেই যুবক হাসবে নাকি কাঁদবে? ভদ্রলোকের এমন কথা শোনার পর আপনারা কি করবেন জানি না, কিন্তু আমি নিজে তো হতবাক হয়ে গেছি। ভদ্রলোক এই কথাগুলো বলতে পেরেছেন কেননা, তিনি পুস্তকবিদ্যায় পুরোপুরি অজ্ঞ তথা মূর্খ । এবার আমি যদি এই ব্যক্তিকে শিক্ষিত বলি তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এমন হাজারো যুবক আমাকে পাগল বলে সম্বোধন করতে বিন্দুমাত্র সময় নিবে না, আবার আমি যদি এই ব্যক্তিকে অশিক্ষিত বলি তখন আপনি হয়তো বলবেন সুশীল সমাজের এমন সামাজিক, চারিত্রিক ও মানবীয় গুণে সর্বোজ্ঞ কোনো ব্যক্তিকে অশিক্ষিত বলা পরিপূর্ণরূপে নাজায়েজ। তাহলে আমি কোনদিকে যাব? তাই স্বশিক্ষায় শিক্ষিত আর স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত এই দুইটি বিষয়কে আলাদা নজরে রেখে আমি ঐ ভদ্রলোককে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত বিষয়টির অধীন করেছি কিন্তু স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত বিষয়টি হতে বিচ্যুত করেছি কেননা, এই ঘটনার পর ঐ ভদ্রলোককে কোনোভাবেই স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত বলা যায় না।
আবার যারা কেবলই পুস্তকবিদ্যায় শিক্ষিত তারা স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত ব্যক্তির তুলনায় জ্ঞানের ভান্ডারে বিন্দুমাত্র পার্থক্যের মালা না গাঁথলেও বাকি সকল দিকে অশিক্ষিতের সমতুল্য হতে খুব বেশি তফাৎ দেখা যায় না। তাই তারাও স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিতের তালিকায় পরে না। প্রশ্ন করুন কিভাবে অথবা আমাকে আমার কথার পূর্ণ ব্যাখ্যা করতে বলুন। আমি করছি...
দেখুন, আমাদের আজকের সমাজে এমন অনেক শিক্ষিত রয়েছে যারা নেশাগ্রস্থ (অন্ততঃ সিগারেট দ্বারা)। সিগারেটের অন্তর্নিহিত গুণ সম্পর্কে নিশ্চয়ই সেই শিক্ষিত অবগত। তারপরেও যখন সে নেশাগ্রস্থ হয় তখন নিশ্চয়ই তাকে স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত বলা যায় না।
আবার ধরুন এমন অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি রয়েছেন যারা শিক্ষার দৌলতে যে ক্ষমতা হাতে পান, ক্ষমতাহীন ও গরিবের উপরে তার প্রয়োগ দেখাতে বিন্দুমাত্র সময়ের অবকাশ রাখেন না।
আবার এমনও অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি রয়েছেন যারা নিজের শিক্ষার গৌরবের বদলে রীতিমতো অহংকার প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করেন না।
আবার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের এমনও অনেক শিক্ষিত যুবক রয়েছেন যারা মনে করেন ফেসবুক গ্রুপে অথবা কোনো আড্ডাখানায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার অর্থ হলো অকথ্য ভাষা ব্যবহার করা, সেক্সুয়াল ভিডিও ফরওয়ার্ড করা, বন্ধুকে শালা বলে ডাকা (তথাপি নিজের বোন সমতুল্য বন্ধুর বোনকে নিজের বউ বানানো), শিক্ষকদের নিয়ে কটুক্তি করা, বন্ধুদের নাম ব্যঙ্গ করা (যেখানে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন, মানুষ সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবেন তার মুখের কারণে)। আবার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অনেক শিক্ষিত যুবক আপনি পাবেন, যারা মেয়েদের সাথে প্রেম (পবিত্র প্রেম অবশ্যই সুখকর ও জায়েজ) নামে অশ্লীলতাকে (যেমন: বিবাহের পূর্বেই বাজে ইঙ্গিতে হাত ধরা, শরীর স্পর্শ করা, ফোন সেক্স করা, শারীরিক সম্পর্ক করা ইত্যাদি) একটি আর্ট বলে মনে করেন। এমনকি সেসব যুবকদের কাছে এমন অশ্লীল প্রেমের মহামান্বিতা এতটাই বেশি যে, যে যুবক সেই অশ্লীল প্রেমে লিপ্ত হয়না, তাদেরকে সেই পথভ্রষ্ট যুবকেরা প্রেম না করার কারণে কটাক্ষ করতেও দ্বিধাবোধ করে না (সাবধান, তোমাদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হবে)। এদেরকে কি আপনি স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত বলবেন?
আবার অনার্স ও এম.এ পাশ করা এমন কিছু গুরুজনও দেখা যায়, যারা পরীক্ষার ফলাফলের পর ফোন কল করে ফলাফল জানার জন্য এবং এর কারণ হিসেবে তারা দাঁড় করায় যে, পরীক্ষার্থীর ভালো ফলাফল শোনার আশায় নাকি তারা অধীর আগ্রহে কল দিয়েছে। কিন্তু সত্যিই যদি তাই হতো তবে পরীক্ষা বা ফলাফলের পরে নয় বরং পরীক্ষার আগে কল দিয়ে নিশ্চয়ই তিনি বা তাঁরা শুভ কামনা শব্দটি বলতেন। আবার এমন কিছু বন্ধুও আছে ৭ মাসে যাদের কোনো খোঁজ থাকে না, অথচ পরীক্ষার ফলাফলের পর হঠাৎ ফোন দিয়ে বলবে, "তোমার খবর বলো।" এদেরকে আর যাই হোক, আমি অন্ততঃ স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত বলবো না, যদিও তারা পুস্তকবিদ্যায় শিক্ষিত। বরং এরা রীতিমতো বিকৃত চিন্তা চেতনার ধারক ও পোষক।
তাহলে সার কথা এই যে, স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হলো তারাই, যারা পুস্তকবিদ্যায় শূন্য বটে, তবে জ্ঞানের ভান্ডারে শূন্য নয়, আবার পরিপূর্ণ ও নয় (কেননা তারা পুস্তকবিদ্যায় শূন্য) এবং জ্ঞানের ভান্ডারে শূন্য নয় এজন্যই বললাম কারণ তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চলাফেরা, প্রয়োজনীয় বিলাসিতা, সামাজিক ও চারিত্রিক আচরণ এতটা নিখুঁত, সাবলীল ও মায়াবী যে তাদের কোনোভাবেই হেয় করা সম্ভব নয়, আর কোনোভাবে তা সম্ভবপর করা গেলেও মানুষ হিসেবে সেটা করা সমীচীন হবে না।
অর্থাৎ তাদের অশিক্ষিত বলা ঠিক হবে না। আবার যেহেতু পুস্তকবিদ্যায় শূন্য তাই তাকে স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত বলাও ঠিক হবেনা বিধায় তাদের স্বশিক্ষায় শিক্ষিত বলাই শ্রেয়। আর স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত হলো তারা, যারা পুস্তকবিদ্যায় শিক্ষিত, ফলে জ্ঞানগর্ভেও পরিপূর্ণ, আবার তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চলাফেরা, প্রয়োজনীয় বিলাসিতা, সামাজিক ও চারিত্রিক আচরণ এতটা নিখুঁত, সাবলীল ও মায়াবী যে তাঁদের সান্নিধ্য পেলেই মুগ্ধতা চলে আসে। তাই আমি তাদের প্রকৃত জ্ঞানী আখ্যা দিয়ে মর্যাদার উচ্চ আসনে বসাতে চেয়েছি।
এত কিছুর পরে এখন নিশ্চয়ই আপনি আমাকে অশিক্ষিতের সংজ্ঞা দিতে বলবেন না। চলুন, সেটাও দিয়ে দিচ্ছি। যারা পুস্তকবিদ্যায় শূন্য, জ্ঞানের ভান্ডারে শূন্য, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চলাফেরা, প্রয়োজনীয় বিলাসিতা, সামাজিক ও চারিত্রিক আচরণ নিতান্তই জঘন্য ও নিন্দনীয় তারাই অশিক্ষিত। দুনিয়া ও পরকাল উভয়ই তাদের ধৃষ্টতার উত্তম জবাবস্বরূপ হেয় প্রতিপন্নতা উপহার দিবে।
লেখক
তুষার আহমেদ ইমন,
মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও
বর্ষসেরা শিক্ষার্থী, ২০১৮ ঢাকা মহানগরী
প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ