এক নার্সের মৃত্যুঃ নিন্দা ও শত প্রাণ বিয়োগে নির্বিকার
১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০৬:১৬ অপরাহ্ন

  

এক নার্সের মৃত্যুঃ নিন্দা ও শত প্রাণ বিয়োগে নির্বিকার

আব্দুল জলিল
১৫-০৫-২০২১ ০১:২১ অপরাহ্ন
এক নার্সের মৃত্যুঃ নিন্দা ও শত প্রাণ বিয়োগে নির্বিকার

আব্দুর রাজ্জাকঃ

গ্রাম –গঞ্জে পূর্বে একটি কথা প্রচলিত ছিলো যে টাকার গায়ে লেখা দেখে মানুষ বলতে একশ টাকাও মাত্র আবার এক টাকাও মাত্র। যার আছে এক হাজার টাকার নোট সেটাও মাত্র আবার যার আছে এক টাকার নোট সেটাও মাত্র। তো বগা চাচাকে একদিন চাচীর সাথে কি এক কথা নিয়ে বলতে শুনেছি. শোন, বেশি কতা বলো না। বেশি টাকাও মাত্র আবার কম টাকাও মাত্র। তাই আমার এক টাকাও একহাজার টাকার মতোই মাত্র। চাচী কয়- আরে রাখ তোমার এক হাজার টেকা। দ্যাশ যে কি হইলো। হাজার টেকা যদি মাত্র হয় তাইলে তোমার এক টেকাতো কিছুই না।

 অনেকদিন পর লিখতে গিয়ে বগা চাচীর সেই কথা এতোদিনে মনে হলো মিথ্যে। এখন একের দাম ১২২ জনের দামের চেয়ে ঢের বেশি। বিশেষত প্রতিবেশি ভারতের নিকটতো বটেই।

বিমান আক্রমণে বোমা বর্ষণ করে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় একের পর বহুতল ভবন মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছে দখলদার ইসরাইল। হত্যা করা হয়েছে ফিলিস্তিনের হামাসের শীর্ষ কমান্ডার ও শিশু সহ ১২২ জনের বেশি প্রতিরোধ আন্দোলনকারী মানুষকে। ইসলামের প্রথম কিবলা আল আকসা মসজিদে নামাজরতদের উপর নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলনকারী হামাস তাদের সর্বোচ্চ অস্ত্র রকেট ছুড়েছে। নিহত হয়েছে ৯ জন। এর মধ্যে ১ জন ভারতীয় নাগরিক। আর এতেই জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি ফিলিস্তিনের রকেট হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। গত কয়েকদিন ধরে ইসরায়েলের বিমান হামলায় অনেক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনে হামলার প্রতিবাদে হামাসের পাল্টা দেড় সহস্রাধিক রকেট হামলায় দিশেহারা ইসরায়েল। এ অবস্থায় ফিলিস্তিনের গাজা সীমান্তে বিপুল পরিমাণ সেনা ও ট্যাঙ্ক মোতায়েন করেছে ইসরায়েল। সেখানে স্থল অভিযান চালানো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে অনেক দেশই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছে। তবে জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি ফিলিস্তিন থেকে ইজরায়েলের উদ্দেশে ছোড়া রকেট হামলার 'বিশেষ' নিন্দা জানিয়েছেন।

ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি টিএস তিরুমূর্তি টুইট করে জানিয়েছেন, পূর্ব জেরুজালেমের ঘটনা নিয়ে আজ জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠকে আমি উল্লেখ করেছি, সব ধরনের হিংসা, বিশেষ করে গাজা থেকে রকেট হামলার নিন্দা করছি। শোকজ্ঞাপন করা হয়েছে ইসরায়েলে ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুতে।                       

উল্লেখ্য, ফিলিস্তিন থেকে ছোঁড়া রকেট হামলায় মৃত্যু হয়েছে ভারতীয় নাগরিক সৌম্যা সন্তোষের। কেরালার ইডুক্কির জেলার বাসিন্দা তিনি। দক্ষিণ ইসরায়েলের উপকূলীয় শহর আশকেলনে এক বৃদ্ধার বাড়িতে নার্স হিসেবে করতেন তিনি।

আর ফিলিস্তিনির নিহত ১২২ জনের মৃত্যুতে তিনি কোন নিন্দা জানাননি। তবে কি ওইসব জীবনের কোনো মূল্য নেই? ইসরায়েলের বোমা হামলার কোনো নিন্দা নেই। সব উল্টো প্রতিক্রিয়া। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বলছে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে। তবে কি ফিলিস্তিনিদের আত্মরক্ষার অধিকার নেই?

এ বিষয়ে আমেরিকা জাতিসংঘের অধিবেশন ডাকাতে বিরোধীতা করছে। মুসলিম বিশ্বের মধ্যে একমাত্র তুরস্ক ফিলিস্তিনের পক্ষে একটু কথা বলছে। কারণ তুরস্ক এখন রাশিয়ান বলয়ে অবস্থান নিয়েছে।

বাকি মুসলিম দেশগুলো নিজদের আঞ্চলিক শক্তির স্বার্থ ও নিজ নিজ দেশ রক্ষার প্রয়োজনে আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র কিনছে। আমেরিকা ইসরায়েলের প্রধান শক্তি। আর আমেরিকার কাছ যে মুসলিম দেশগুলো অস্ত্র কিনছে বিশেষ করে সৌদি আরব। এ দেশগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কিছু বলবে না। এর কারণও আছে। বেশকিছুদিন আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন সৌদির উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করলে সৌদি আরব ৩ ঘন্টাও টিকতে পারবে না।কথা কিন্তু সত্য। কারণ ইরান ইয়েমেনের হুথিদের (শিয়া) যারা ইতোমধ্যে ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে সরকার পরিচালনা করছে। আর সৌদিতে কার্যকর ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। সৌদি আমেরিকার সাহায্য নিয়েও সফলতা পাচ্ছে না। সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করেছিল। তারপর থেকে কুয়েত আমেরিকার উপর নির্ভরশীল। সম্প্রতি আমেরিকার মধ্যস্থতায় কাতারসহ কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। কাজেই তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কিছু বলবে না।

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ইরান হলো আমেরিকার বিরোধী। ইরানের উপর আমেরিকা অনেক নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। ইরানের জেনারেল কাশেম সোলায়মানিকে ঘোষণা দিয়ে ড্রোন হামলা করে নির্মমভাবে হত‍্যা করেছে। ইরানের দূর্বল নিরাপত্তার সুযোগে ইসরায়েল ইরানের পরমানু বিজ্ঞানী হত‍্যা ও পারমানবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দিয়েছে। এসব কারণে ইরান ফিলিস্তিনের হামাস (শিয়া) কে সমর্থন করে। আর লেবাননের হিজবুল্লাহ (শিয়া) হামাসকে সমর্থন। আর সিরিয়ায় মোতায়েন ইরানী সৈন্য (শিয়া) মাঝেমাঝে ইসরাইলে রকেট হামলা চালাতে পারে। এরা কিন্তু ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে না। কাজেই মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এক জোট হয়ে ফিলিস্তিনের পক্ষ নিবে তা আশা করা যায় না।

একমাত্র লেবাননের হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। এখানে আবার ইরানের স্বার্থ আছে। আর যেখানে ইরানের স্বার্থ আছে সেখানে সৌদি পিছিয়ে যাবে।

এ দিকে ফিলিস্তিনেও ২টি গ্রূপঃ একটি প্রয়াত ইয়াসির আরাফাতের আলফাত্তা যার বর্তমান নেতা মাহমুদ আব্বাস। তিনি ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট এবং সৌদি বলয়ের সূন্নী পন্থি। বতর্মান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তার তৎপরতা তেমন দেখা যাচ্ছে না।

অপর অংশ ইসমাইল হানিয়ার নেতৃত্বে হামাস। এ অংশ গাজা ও পশ্চিম তীর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। এ অংশের উপর প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস নিয়ন্ত্রণ নেই। এ অংশ ইরান ও লেবানন পন্থি শিয়া। এ অংশ প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে পাশ কাটিয়ে একা যুদ্ধ করছে। এখানেও শিয়া ও সুন্নীর প্রভাব বিস্তার নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে ফিলিস্তিনিরা এক হয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়তে ব্যর্থ। আর এক হওয়া সহজ নয়। অনেক ফ্যাক্টর। কাজেই ফিলিস্তিনিরা মার খাচ্ছে। যতদিন মুসলিমরা শিয়া, সুন্নী ও অন্যান্যদের মতভেদ ভুলে এক না হবে ততদিন আমেরিকা ও ইসরায়েল বিভিন্ন মতের দেশ বা গ্রূপকে বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করে দূর্বল করে রাখবে। ফলে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সুদূর পরাহত থেকে যাবে।  

    লেখক ডেপুটি ডিরেক্টর/ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও কলামিস্ট

 


আব্দুল জলিল ১৫-০৫-২০২১ ০১:২১ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 675 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com