যমুনার সর্বগ্রাসী থাবায় নিশ্চিহ্ন কাজিপুরের বিস্তীর্ণ জনপদ
২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:১৩ অপরাহ্ন

  

যমুনার সর্বগ্রাসী থাবায় নিশ্চিহ্ন কাজিপুরের বিস্তীর্ণ জনপদ

আব্দুল জলিল
২৮-০২-২০২১ ০৯:৩৩ অপরাহ্ন
যমুনার সর্বগ্রাসী থাবায় নিশ্চিহ্ন কাজিপুরের বিস্তীর্ণ জনপদ

 সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের আফানিয়া গ্রামের বৃদ্ধা হাসনা বেগমের দীর্ঘশ্বাস আর বোঁবা কান্না যেন আর থামে না। যমুনাকে দেখিয়ে তিনি অশ্রসিক্ত চোখে বলেন, ‘ওই আমারে সর্বনাশ করেছে। বসতঘর, ফসলি জমি সব কিছু গ্রাস করেছে।’ তিনি সম্প্রতি হারিয়েছেন তার ঘর।

সহায়-সম্বল হারিয়ে তিনি আজ নিঃস্ব। অথচ এক সময় তিনি গেরস্ত ঘরের বৌ ছিলেন। যমুনার করাল গ্রাসে সব হারিয়ে ওই বৃদ্ধা এখন আশ্রয় নিয়েছেন ওয়াপদার বেড়িবাঁধে। এমনই গৃহহারা হাজারও মানুষ। তবে বর্তমান সরকার ভাঙন রোধে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। যমুনার সর্বগ্রাসী থাবায় মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে কাজিপুর সদর, মাইজবাড়ী, গান্ধাইল ও শুভগাছা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। এ ছাড়া খাসরাজবাড়ী, নাটুয়ারপাড়া, তেকানী, নিশ্চিন্তপুর, চরগিরিশ ও মনসুর নগর ইউনিয়নের অনেক গ্রাম তীব্র ভাঙনের শিকার।

১৯৫৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কাজিপুরে ভাঙন প্রতিরোধে ছোট-বড় অনেক পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সলিড স্পার অনেক বছর টিকে ছিল। কিন্তু চার-পাঁচ বছর আগে তীব্র ভাঙনের মুখে সেগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আগে ও পরবর্তী সরকারগুলোর দেওয়া কোটি কোটি টাকার একটি বড় অংশই ঠিকাদার, পাউবো কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিবিদরা লুটে পুটে খেয়েছেন। কাজ হয়েছে শুধু লোক দেখানে। ১৫০ টন চাল ব্যয়ে চরছিন্না-গোদারবাগ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ গত দুই মাসের মধ্যেই (৩ জুলাই ২০১৩) বিলীন হয়ে যায় যমুনা নদীগর্ভে।

বর্তমানে ছয়টি স্পটে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। যমুনার এমন তাগুবে নদীশিকস্তি মানুষেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বাপ-দাদার বসতভিটা আর সহায়-সম্পদ হারিয়ে তারা এখন বড় অসহায়। নদীর পূর্বপাড়ে ভাঙন ক্রমেই ধেয়ে আসায় আশপাশের লোকালয়ে আতস্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পূর্ব-পশ্চিমের তীব্র বাতাসের কারণে নদীর ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বর্ষার পানি। গত কয়েকদিনে শুভগাছা, মনসুরনগর, কাজিপুর সদর ও চরগিরিশ এলাকার আশপাশের বিস্তীর্ণ জনপদ যমুনা গ্রাস করে নিয়েছে।

প্রায় দুই কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ, দোকানপাট, স্কুল, মসজিদ, কয়েকশ’ বসতঘর, ফসলি জমি, গাছগাছালির বাগান বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে শুভগাছা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ। চাঁননগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আঃ সালাম জানান, এবারের বর্ষায় আফানিয়া ও চাঁদনগর গ্রামের অবশিষ্ট অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। আফানিয়া গ্রামের ক্ষুদে ব্যবসায়ী জানান, ভাঙনের তাড়া খেয়ে এ পর্যন্ত তারা ৩-৪ বার দোকান পিছিয়েছেন। আগামীতে কোথায় যাবেন সেই ঠিকানাও খুঁজে পাচ্ছে না।

কাজিপুর উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক বকুল সরকার জানান, নদীভাঙনে তার পরিবার ৫-৬ বার জায়গা বলদ করেছে। এখন বাধ্য হয়েই তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে দুর্গম মধ্যেই আছেন। ৩৬৮.৬৩ বর্গকিলোমিটারের জনপদ কাজিপুরের তিনভাগই যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ১২টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে এখন অবশিষ্ট আছে মাত্র তিনটি। আবার যমুনার পূর্বপাড়ে বেশ কয়েকটি চর জেগে উঠলেও চরের মালিকানা নিয়ে ভূমিহীন-জোতদারের মধ্যে চলছে বিরোধ। নদীশিকস্তি পরিবারগুলো সেখানে আশ্রয় নিতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়ছে।   

এদিকে শুভগাছা, গান্ধাইল ও কাজিপুর সদর ইউনিয়নের প্রায় প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। দুই বছরের ভাঙনে এসব এলাকার প্রায় এক হাজার বসতঘর, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তিনটি মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।  চাঁদনগর, দক্ষিণ শুভগাছা, আফানিয়া, ঝুনকাইল, বীরশুভগাছা, আমনমেহার, দোয়েল গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বাঁস ও গাছের ডালপালা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

রতনকান্দি গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবক রিয়াজ তালুকদারের উদ্যোগে ভাঙন ঠেকাতে ওই এলাকায় হাজার হাজার বালির বস্তা ও বাঁশ দিয়ে বাঁধ তৈরি করেছেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। এলাকার আমিনুল ইসলাম, শাহজাহান আলী, মজনু, আবুল কালাম, কাশেম জানান, নারী-পুরুষ মিলে হাতের কাছে যা পাচ্ছেন, তাই নদীতে ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছেন। এসব এলাকার মধ্যে বেশি ভাঙছে আফানিয়া ও ঝুনকাইল গ্রাম। এলাকার ২টি মসজিদ ও ৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন ভাঙনের মুখে।   


আব্দুল জলিল ২৮-০২-২০২১ ০৯:৩৩ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 522 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com