একুশে পদক-২০২১ গ্রহণ করলেন সৈয়দা ইসাবেলা'র পরিবার
আজ শনিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে একুশে পদক-২০২১ প্রদান অনুষ্ঠানে মহান মুক্তিযুদ্ধে অনবদ্য ভূমিকা রাখায় সিরাজগঞ্জের কৃতীসন্তান মরহুমা সৈয়দা ইসাবেলা'র পক্ষ থেকে মরণোত্তর একুশে পদক গ্রহণ করেন তার সুযোগ্য সন্তান পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গণভবন থেকে সরাসরি যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা বাঙালি, বাংলা আমাদের দেশ। এই বাংলাদেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলবে, সম্মানের সঙ্গে চলবে। কারো কাছে হাত পেতে নয়, আমরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আত্মমর্যাদা ও সম্মান নিয়ে বিশ্বের বুকে চলবো।’ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে একুশে পদক তুলে দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।
উল্লেখ্য, গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারী (বৃহস্পতিবার) সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের যুগ্মসচিব অসীম কুমার দে স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপির মাধ্যমে একুশে পদক-২০২১ স্বীকৃতিপ্রাপ্তদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এবারের তালিকায় দেশের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিসরুপ মোট ২১ জন বিশিষ্ট নাগরিকদের এই পদকে মনোনীত করা হয়েছে। আমাদের সিরাজগঞ্জ জেলার ২জন কৃতীসন্তান এবারের একুশে পদকে (মরনোত্তর) মনোনীত করা হয়। একজন সিরাজগঞ্জ জেলার সাবেক গভর্ণর ও সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের আমৃত্যু সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মোতাহার হোসেন তালুকদার (ভাষা আন্দোলন) এবং অপরজন বীর মু্ক্তিযোদ্ধা, কবি, লেখক, সাহিত্যিক মরহুমা সৈয়দা ইসাবেলা (মুক্তিযুদ্ধ)। এর আগে সিরাজগঞ্জ জেলার আরো ৯জন বিশিষ্ট ব্যাক্তি একুশে পদক লাভ করেছেন।
সৈয়দা ইসাবেলার সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ
নারী সমাজের প্রগতির দিশারী রত্নগর্ভা মা সৈয়দা ইসাবেলা ছিলেন সিরাজগঞ্জের খ্যাতনামা সৈয়দ পরিবারের মেয়ে। সৈয়দা ইসাবেলা নারী জাগরনে এবং দেশের স্বাধিনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অন্যন্য নাম। ১৯৪২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মরহুম সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক ও আছিরুন নেছা খন্দকারের পরিবারে তিনি জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মাতা দু জনেই ছিলেন শিক্ষক। বড় চাচা সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী উপমহাদেশে মুসলিম রেনেসাঁর অগ্রদূত, তুরস্কের পক্ষে বলকান যুদ্ধে যোগদান করে গাজী-এ- বলকান উপাধিতে ভূষিত হন। সৈয়দা ইসাবেলা বাণীকুঞ্জ নামে সিরাজগঞ্জের যে বাড়িতে বেড়ে উঠেছেন সে বাড়িটির নাম দিয়ে ছিলেন আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ব্যক্তি জীবনে সৈয়দা ইসাবেলা সিরাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে অধ্যায়নরত অবস্থায় ১৯৫৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আমলাপাড়া নিবাসী আনোয়ার হোসেন রতুর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামী আনোয়ার হোসেন রতু মুক্তিযুদ্ধকালীন সিরাজগঞ্জ সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। সৈয়দা ইসাবেলা নারীদের শিক্ষিত করেছেন সকল বাধার মুখে। একাত্তুরে দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু তিনি বিশ্রাম নেননি। থামাননি পথচলা। সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ১৯৭৩ সালে যোগ দেন শহরের গৌরী আরবান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। দায়িত্ব নেন প্রধান শিক্ষকের। ২০০২ সালে গৌরী আরবান উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে অবসর নেয়ার পর থেকে সাহিত্যচর্চাশুরু করেন। লেখা লেখির মাত্র ৮ বছরে ২২ টি বই গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে অমানিশার জোনাকি, পুরুষোত্তম, অন্তরের কাছাকাছি, নারীর মন, কাছে থেকে দেখা, পাখির পালক ও রাজপ্রত্ররা, যাদুর প্রদীপ, ফিরে পাওয়া, নেংটি ইঁদুর ও বুড়ো বিড়াল, মালাচির কুটির, বুগলী সোনা পাখি, শেষ বেলার বন্ধু, আয়নায় মুখ, মুক্তিযুদ্ধে আমি, মহাতীর্থ ঘুরে এলাম, অনন্ত পিপাসা, স্মৃতিকথা, রঙ্গনা, অচেনা প্রমূখ উল্লেখযোগ্য। সংসার জীবনে সৈয়দা ইসাবেলা ৭ সন্তানের মা। মা হিসেবেও তিনি রেখেছেন সফলতার ছাপ। ৫ কন্যা ও এক পুত্র সন্তান রয়েছে। তারা প্রত্যাকেই স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলছেন। এ কারনে ২০১০ সালে সৈয়দা ইসাবেলা একজন রত্মগর্ভা মা হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন। ১১ জানুয়ারী ২০১৩ সালে মহীয়সী নারী সৈয়দা ইসাবেলা মৃত্যুবরণ করেন।