মরণোত্তর একুশে পদক ২০২১-এ ভূষিত সিরাজগঞ্জের দুই কৃতীসন্তান
২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:৫৬ অপরাহ্ন

  

মরণোত্তর একুশে পদক ২০২১-এ ভূষিত সিরাজগঞ্জের দুই কৃতীসন্তান

করেসপন্ডেন্ট, সিরাজগঞ্জ
০৪-০২-২০২১ ১১:৫৪ অপরাহ্ন
মরণোত্তর একুশে পদক ২০২১-এ ভূষিত সিরাজগঞ্জের দুই কৃতীসন্তান

৪ঠা ফেব্রুয়ারী (বৃহস্পতিবার) সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের যুগ্মসচিব অসীম কুমার দে স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপির মাধ্যমে একুশে পদক-২০২১ স্বীকৃতিপ্রাপ্তদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এবারের তালিকায় দেশের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিসরুপ মোট ২১ জন বিশিষ্ট নাগরিকদের এই পদকে মনোনীত করা হয়েছে। আমাদের সিরাজগঞ্জ জেলার ২জন কৃতীসন্তান এবারের একুশে পদকে (মরনোত্তর) মনোনীত হয়েছেন। একজন সিরাজগঞ্জ জেলার সাবেক গভর্ণর ও সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের আমৃত্যু সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মোতাহার হোসেন তালুকদার (ভাষা আন্দোলন) এবং অপরজন বীর মু্ক্তিযোদ্ধা, কবি, লেখক, সাহিত্যিক মরহুমা সৈয়দা ইসাবেলা (মুক্তিযুদ্ধ)। এর আগে সিরাজগঞ্জ জেলার আরো ৯জন বিশিষ্ট ব্যাক্তি একুশে পদক লাভ করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী বঙ্গভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মনোনিত ব্যাক্তি বা উত্তরসূরীদের পুরুষ্কার প্রদান করবেন বলে জানানো হয়েছে।

মোতাহার হোসেন তালুকদার রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল নাম। মোতাহার হোসেন তালুকদার ১৯২২ সালে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার গজারিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার নিজ বাসভবনে ২০০১ সালের ২রা ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মোতাহার হোসেন তালুকদার ১৯৪৬ সালে তদানিন্তন মুসলীম ছাত্রলীগে যোগদান করেন। তিনি ১৯৪৭ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের জিএস, ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালে রাজশাহী গভর্মেন্ট কলেজের জিএস ও ভিপির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা অন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই সংগঠনের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৬৮ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মোতাহার হোসেন তালুকদার ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযাযোদ্ধা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি রংপুরের রৌমারীতে মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্প গঠন করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। ১৯৭৫ সালে তাকে সিরাজগঞ্জ জেলার জেলা গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারম্যান এবং ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির পরিচালক, হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের পরিচালক এবং বিসিকের চেয়ারম্যান পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন। মোতাহার হোসেন তালুকদার ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে কাজিপুর-সিরাজগঞ্জ নির্বাচনি এলাকা থেকে জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন।

নারী সমাজের প্রগতির দিশারী রত্নগর্ভা মা সৈয়দা ইসাবেলা ছিলেন সিরাজগঞ্জের খ্যাতনামা সৈয়দ পরিবারের মেয়ে। সৈয়দা ইসাবেলা নারী জাগরনে এবং দেশের স্বাধিনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অন্যন্য নাম। ১৯৪২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মরহুম সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক ও আছিরুন নেছা খন্দকারের পরিবারে তিনি জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মাতা দু জনেই ছিলেন শিক্ষক। বড় চাচা সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী উপমহাদেশে মুসলিম রেনেসাঁর অগ্রদূত, তুরস্কের পক্ষে বলকান যুদ্ধে যোগদান করে গাজী-এ- বলকান উপাধিতে ভূষিত হন। সৈয়দা ইসাবেলা বাণীকুঞ্জ নামে সিরাজগঞ্জের যে বাড়িতে বেড়ে উঠেছেন সে বাড়িটির নাম দিয়ে ছিলেন আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ব্যক্তি জীবনে সৈয়দা ইসাবেলা সিরাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে অধ্যায়নরত অবস্থায় ১৯৫৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আমলাপাড়া নিবাসী আনোয়ার হোসেন রতুর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামী আনোয়ার হোসেন রতু মুক্তিযুদ্ধকালীন সিরাজগঞ্জ সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। সৈয়দা ইসাবেলা নারীদের শিক্ষিত করেছেন সকল বাধার মুখে। একাত্তুরে দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু তিনি বিশ্রাম নেননি। থামাননি পথচলা। সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ১৯৭৩ সালে যোগ দেন শহরের গৌরী আরবান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। দায়িত্ব নেন প্রধান শিক্ষকের। ২০০২ সালে গৌরী আরবান উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে অবসর নেয়ার পর থেকে সাহিত্যচর্চাশুরু করেন। লেখা লেখির মাত্র ৮ বছরে ২২ টি বই গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে অমানিশার জোনাকি, পুরুষোত্তম, অন্তরের কাছাকাছি, নারীর মন, কাছে থেকে দেখা, পাখির পালক ও রাজপ্রত্ররা, যাদুর প্রদীপ, ফিরে পাওয়া, নেংটি ইঁদুর ও বুড়ো বিড়াল, মালাচির কুটির, বুগলী সোনা পাখি, শেষ বেলার বন্ধু, আয়নায় মুখ, মুক্তিযুদ্ধে আমি, মহাতীর্থ ঘুরে এলাম, অনন্ত পিপাসা, স্মৃতিকথা, রঙ্গনা, অচেনা প্রমূখ উল্লেখযোগ্য। সংসার জীবনে সৈয়দা ইসাবেলা ৭ সন্তানের মা। মা হিসেবেও তিনি রেখেছেন সফলতার ছাপ। ৫ কন্যা ও এক পুত্র সন্তান রয়েছে। তারা প্রত্যাকেই স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলছেন। এ কারনে ২০১০ সালে সৈয়দা ইসাবেলা একজন রত্মগর্ভা মা হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন। ১১ জানুয়ারী ২০১৩ সালে মহীয়সী নারী সৈয়দা ইসাবেলা মৃত্যুবরণ করেন।


করেসপন্ডেন্ট, সিরাজগঞ্জ ০৪-০২-২০২১ ১১:৫৪ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 1425 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com