বরইতলার যুদ্ধ আমাদের মুক্তির প্রেরণার উৎস
২০ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন

  

বরইতলার যুদ্ধ আমাদের মুক্তির প্রেরণার উৎস

আব্দুল জলিল
১৭-১১-২০২০ ০১:১৫ অপরাহ্ন
বরইতলার যুদ্ধ আমাদের মুক্তির প্রেরণার উৎস

ফজলুল হক মনোয়ারঃ  সভাপতি সচেতন নাগরিক সমাজ ও সাবেক বিডিআর সদস্য

                  

রোজার শেষদিক, ঈদের মাত্র ২/৩ দিন বাকি, কিন্তু ঈদের আমেজ নেই যুদ্ধের কারনে। মানুষ সবসময় আতংকিত থাকে। বাড়ীটি বেশ ফাঁকাফাঁকা লাগছে। কারণ গতরাতেও বাড়ীতে প্রায় ৪০/৫০ জন লোক ছিল। আমাদের বাড়ীতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল, গতরাতে খাবার খেয়ে সকলেই উত্তর পাড়া চলে যায়। তারা চলে যাবার পরই মা সিগারেটের গোড়াগুলি মাটিতে পুতে রাখে, উদ্দেশ্য পাকসেনা এসে এত সিগারেটের অংশ দেখলে সন্দেহ করতে পারে, তাই এ কাজ করেন ।

 সকালে আনুমানিক ৯/১০ টার দিকে ১২৫/১২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা গেঞ্জি গায়ে রাইফেল কাধে করে আমাদের বাড়ীর পাশ দিয়েই রাস্তা দিয়ে লাইন ধরে নয়াপাড়া পার হয়ে বরইতলার দিকে যাচ্ছে। যতদূর চোখ গেল দেখলাম। মার কাছে শুনলাম রাতে প্রায় ১৫০/১৬০ ( আনুমানিক) মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাড়ীতে মিটিং করে, সবাই উত্তর পাড়া চলে যায়, তারাই এখন বরইতলার দিকে যাচ্ছে। আগের দিন মুক্তিযোদ্ধারা চলে যাওয়ার কারণে বাড়ীটি ফাঁকা হয়ে গিয়েছে।

শেষ রাতে (১৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে) সেহরি খেতে বসেছি, হঠাৎ শব্দ। মা বললো, দেখতো নৌকাটা মনে হয় কেউ নিয়ে যাচ্ছে। আমি খাওয়া বাদ দিয়ে নৌকাটা দেখার জন্য ঘরের বাইরে আসার সাথে সাথে আমার চাচাতো ভাই এর শ্যালক মন্তাজ ভাই চিৎকার দিয়ে এসে বললো, বরইতলায় মেলেটারি এসেছে। সারা গ্রামে আগুন দিয়েছে। সবাই বাড়ীর পশ্চিম পাশে গিয়ে দেখি আগুন আর আগুন, মাঝে মাঝে ঝাকে ঝাকে গুলি। বাড়ীর মহিলাদের বাড়ীর পূর্বদিকে নিরাপদে পাঠিয়ে দিয়ে বাড়ীতে চলে আসলাম। আর মনে করছিলাম হয়তো মুক্তিযোদ্ধারা বিপদে পড়েছে। ঘটনাও তাই, চেয়ারম্যান ইমান আলীর লোকেরা নাকি পাক সেনাদের নিকট মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের কথা জানিয়ে দিয়েছে।

 

যুদ্ধ চলছে। আমরা আমাদের আমবাগানের ভিতর দাঁড়িয়ে দেখছি। গুলি মাঝে মাঝে বাগানের সামনে জমির ভিতর পানিতে পড়ছে। আমাদের করার মত তখন কিছুই ছিল না। একটার দিকে খবর এলো আমাদের পাড়ার দিকে পাকসেনা আসছে পূর্বদিক থেকে। আমরা তখন দক্ষিণ দিকের সড়ক পার হয়ে আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম।

পাকসেনারা তখন আমাদের বাঁশবাগান পার হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পিছন থেকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা সংখ্যায় ছিল ২৬ জন। আমাদের গ্রামের সন্দেশ চাচাকে ওরা ধরে নিয়ে আসে পথ দেখানোর জন্য। আমরা সংবাদ দেওয়ার আগেই এদের আসার সংবাদ মুক্তিযোদ্ধারা জেনে যায়। তাই তাদের কোন ক্ষতি ওরা করতে পারে নাই। ওরা চলে যাবার পর আমরা নয়াপাড়ার দিকে এগোতে থাকি। হঠাৎ আমাদের সামনে আখক্ষেতের ভিতর হতে গুলির আওয়াজ এলো। এর পর আর নাই। আমরা এগিয়ে গেলাম, দেখলাম আমাদের স্কুলের দশম শ্রেনীর জয়নাল ভাই ( যিনি একজন জাদুকর ও ছিলেন) খুব দুর্বল অবস্থায় রাইফেল হাতে একবার উঠছে আবার বসছে। আমরা এগিয়ে গেলাম, দেখলাম তার সারা শরীর পানিতে ভিজা।পানির ভিতর থেকে যুদ্ধ করতে করতে দল ছুট হয়েছে। তাতে তার রাইফেল কাঁদায় মাখামাখি হয়ে গেছে। আমরা ওনাকে সাধ্যমত সেবা দিলাম। উনি চলে গেলেন।

 এরপর যুদ্ধ চলতে থাকলো। সন্ধ্যার আগে বরইতলা হতে পাকসেনারা খামারপাড়ায় আগুন দিয়ে পূর্বদিকে থানার দিকে চলে গেল।

  এই যুূৃদ্ধে আমার দুই সহপাঠী কুদ্দুস ও চানমিয়া সহ ১০৪ জন শহীদ হয়, রবিলাল দাস, সুজাবত আলী, আব্দুস সামাদ নামের তিন জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আর ৬ জন পাক আর্মি সহ এক রাজাকার নিহত হয়। ( পরে জানা যায়, অনেক পাক আর্মি নিহত হয়েছে, তাদের লাশ পাটের গাড়ীতে সিরাজগঞ্জ পাঠানো হয়েছে) । উল্লেখ্য আমার বন্ধু কুদ্দুস ও তার পিতা শামসুল হক চাচা এক সাথে শহীদ হন এবং কুদ্দুসের চাচা আফসার চাচা কানের পাশে গুলি লেগে আহত হন। ঐ দিন মসজিদে ইত্তেকাফরত মুসুল্লিরা তাদের হাত হতে বাঁচতে পারেন নাই। গুলির স্মৃতি চিহ্ন আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন আফসার চাচা । এই দিন আমাদের পাশের বাড়ীর ওমেদ আলী মামার স্ত্রী আখক্ষেতে একটি মেয়ে সন্তান জন্ম দেন, সকলে তার নাম দেয় মুক্তি, আজো সে মুক্তি নামেই পরিচিত


আব্দুল জলিল ১৭-১১-২০২০ ০১:১৫ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 371 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com