কাজিপুরে চরাঞ্চলের প্রতিবন্ধীদের পাশে একজন স্বপন
২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৫৬ অপরাহ্ন

  

কাজিপুরে চরাঞ্চলের প্রতিবন্ধীদের পাশে একজন স্বপন

আব্দুল জলিল
৩১-১০-২০২০ ১১:৫৪ অপরাহ্ন
কাজিপুরে চরাঞ্চলের প্রতিবন্ধীদের পাশে একজন স্বপন

আবদুল জলিল ঃ ওরা প্রতিবন্ধী। এই পৃথিবীর আলো-বাতাস আর জল-খাবার আর সব মানুষের মতোই ভোগ করার অধিকার আছে। আছে স্বাভাবিক জীবন-যাপনের অধিকার। কিন্তু প্রকৃতি ওদের খানিকটা আলাদা করে সৃষ্টি করায় সেই সুযোগ থেকে ওরা বঞ্চিত হচ্ছে। সেই সাথে ওদের সাথে স্বাভাবিক মানুষদের অস্বাভাবিক আচরণ আর ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ফলে ওরা এখন বেঁচে থেকেও মরা মানুষের মতো নিশ্চল। ওদের বাস সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের খাসশুড়িবেড়, উত্তর তেকানী, রেহাইশুড়িবেড়, নাটুয়ারপাড়া, চরনাটিপাড়া, ও পানাগাড়ি গ্রামে। এসব গ্রামের প্রায় দেড়শতাধিক মানুষ প্রতিবন্ধী। সদ্য জন্ম নেয়া শিশু যেমন এই কাতারে আছে তেমনি অশীতিপর বৃদ্ধও আছে। সম্প্রতি কাজিপুর উপজেলা সমাজসেবা অফিসের আয়োজনে প্রতিবন্ধীতা সণাক্তকরণের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। সভায় প্রতিবন্ধী সণাক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হলেও তাদেরকে সাহায্যের আওতায় আনার ব্যাপারে কোন আশার কথা শোনা যায়নি। প্রতিবন্ধীদের জন্য যে প্রকল্পগুলো বর্তমান সরকার হাতে নিয়েছিল সেসব প্রকল্পে গত দু’বছর যাবৎ নতুন করে সুবিধাভোগী নির্বাচন করে তাদের মাঝে অর্থ সহায়তা প্রদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে উপজেলার প্রতিবন্ধিদের মাঝে হতাশা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। যমুনা শিকস্তি এই উপজেলার দূর্গম চরাঞ্চলসহ প্রায় সব গ্রামেই এই সংখ্যা যেমন বেড়ে চলেছে, তেমনি বাড়ছে তাদের মাঝে চরম হতাশা। বিশেষ করে যমুনার চরাঞ্চলে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। স¤্রাট আলী, আশামনি, মীম, উর্মি, শুভ, পলি, বেলী, নাজমা, সেলিম, সুজন, শিপন, মাসুদ, কদম আলী, বিদ্যুৎ, সাত্তার, মিজানুর, হৃদয়, সুমন, সুমাইয়া, দুলালী, সাইফুল, উজাল শেখ, স্মরণী, লোকমান, এরা সবাই চরাঞ্চলের সুন্দর নামের প্রতিবন্ধী মানুষ। সৃষ্টিকর্তা ওদের আর সব মানুষের চেয়ে আলাদা করে সৃষ্টির মাঝে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ রেখেছেন । এদের কারো পা, হাত, অথবা মাথা অন্যসবার চেয়ে আলাদা, কারো বা কথা বলার শক্তি নেই আজীবনের জন্য, কেউবা এই সুন্দর পৃথিবীর আলো-বাতাস ভোগ করে কিন্তু দেখার শক্তি নেই। সম্প্রতি ওদের চরে দেখতে গেলে ক্যামেরার সামনে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ওরা বোঝেনা যে ওরা স্বাভাবিক মানুষের মতো না। আর ওদের মধ্যে যারা বোঝে তাদের কথা কেউ ভাবেনা। তাদের মনোবেদনা বোঝার বা শোনার যেন এই দুনিয়ায় কেউ নেই।  

বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীদের জন্য ভিজিডি, ভিজিএফ এসব প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজে তাদের টিকে থাকায় সহায়তা করলেও তা যথেষ্ট নয়।

কাজিপুর সমাজসেবা অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রায় পৌনে তিন লাখ জনগোষ্ঠির এই উপজেলায় বর্তমানে প্রতিবন্ধি ভাতা পায় মাত্র ছয়শ সাতচল্লিশ জন, প্রতিবন্ধি শিক্ষা ভাতা পাচ্ছে আটচল্লিশ জন। এদের প্রত্যেকে প্রতিমাসে তিনশ করে টাকা পায়। প্রতি তিন মাস পরপর ব্যাংকের মাধ্যমে এই টাকা সুবিধাভোগিরা উত্তোলন করে থাকে। কিন্তু উপজেলায় প্রকৃত সুবিধাভোগির সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। কাজিপুর সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ জানান, সর্বশেষ ২০১০-২০১১ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। এরপর থেকে নতুন করে কোন বরাদ্দ আসেনি। তিনি জানান,  উপজেলার সব প্রতিবন্ধীর তালিকা তাদের কাছে নেই। ফলে চরাঞ্চলের হাজারো প্রতিবন্ধী দিনাতিপাত করছে কোন প্রকার সরকারী সাহায্য ছাড়াই। অযতেœ-অবহেলায় কেউ কেউ এর-ওর কাছে হাত পেতে সাহায্য নিয়ে বাঁচার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে। অবশেষে চরের এই বহুসংখ্যক অসহায়দের পাশে এসে দাাঁড়িয়েছে এক সমাজ দরদী প্রচারবিমূখ মানুষ। চরেরই মানুষ তিনি। নাম  জাহিদুল হাসান স্বপন । স্বল্পশিক্ষিত এই যুবকের কাজই হলো প্রতিবন্ধীদের সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর নেয়া। দিনের বেশ খানিকটা সময় এসব করে ব্যয় করেন তিনি।  সংসারের নাগপাশে ধরা না দিয়ে বেশ ক’বছর যাবৎ তিনি চরাঞ্চলের প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছেন। সমাজের বিত্তবানদের নিকট থেকে অর্থ সহায়তা নিয়ে নিজে কিছু যোগান দিয়ে তা বিলিয়ে দেন প্রতিবন্ধীদের মাঝে। আরেক সমাজ দরদী আমিনুল ইসরামের সহায়তায় তিনি নামের একজনের মাধ্যমে এইসব প্রতিবন্ধীদের মাসে তিনশত থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বৃত্তির ব্যবস্থা করেছেন। অবশ্য এটা নিয়মিত করতে পারেন না তিনি। প্রতিমাসে প্রায় দেড়শজন এই সুবিধা পাচ্ছে। এছাড়া দুই ঈদে তিনি এদের জন্য বিশেষ খাবার এবং সাহায্যের ব্যবস্থা করেন। এদের মধ্যে কেউ গুরুত্র অসুস্থ হলে তিনি াামিনুলের সহায়তায় তাদের ঢাকায় এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। চিকিৎসার সমস্ত ব্যয়ভার তিনি নিজেই বহন করেন। সম্প্রতি কাজিপুর উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক বকুল সরকার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাফিউল ইসলাম খাসশুড়িবেড় উচ্চ বিদ্যালয়ে এসব প্রতিবন্ধীদের দেখতে গিয়েছিলেন। তারা দুজনই জাহিদ স্বপনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। এসময় নাটুয়ারপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হক সরকার, সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান চাঁন, বিদ্যালয়ের সভাপতি সমাজ সেবক ফরিদুল হক সরকারসহ গন্যমান্য ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন। তারাও প্রতিবন্ধীদের সাহায্যে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি এই প্রতিবেদককে  জানান, আমরা স্বাভাবিকভাবে জীবন-যাপন করে কত দুঃখ, যন্ত্রণা অনুভব করি। আর ওরাতো অস্বাভাবিক। ওদের মনের জ্বালা আরো কত গভীর। এই অনুভূতি থেকেই তাড়িত হয়ে ওদের জন্য সামান্য কিছু করার চেষ্টা করছি মাত্র। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমৃত্যু আমি প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করে যাবো। ভবিষ্যতে একটা প্রতিবন্ধী হাসপাতাল করার ইচ্ছেও তার রয়েছে বলে তিনি জানান।

 

 


আব্দুল জলিল ৩১-১০-২০২০ ১১:৫৪ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 338 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com