শিরোনামঃ
আব্দুল জলিল ১৮-১০-২০২০ ০৩:০৮ অপরাহ্ন |
আবদুল জলিলঃ দিনের পর দিন বাংলাদেশে ধর্ষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ কারণে সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড করেছে। মেডিকেল সনদের বাধ্যবাধকতা পরিহার করা হয়েছে। তারপরেও কমছে না ধর্ষণ। একের পর এক মায়ের সামনে মেয়েকে, মা মেয়ে দুজনকেই, বিধবাকে, বিধবা নানী দাদীকে, কিশোরী, গৃহবধু, তিন বছরের শিশু কেউই বাদ যাচ্ছে না। এর নৃশংসতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যৌনাঙ্গ কেটে বড় করে, যৌনাঙ্গে অন্য কিছু ঢুকিয়ে বড় করে এমনকি অজ্ঞান করে , হাত-পা মুখ বেধে একজন বা একাধিক জনও ধর্ষণ করার লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে চলেছে। আবার ধর্ষণের পর যন্ত্রণা দিয়ে তাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। আর এই পাশবিকতা যে শুধু নারীর সাথেই ঘটছে তাও নয়। অনেক ছেলে শিশুও এর শিকার হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে ধর্ষণ করে তা ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। মোট কথা এমন কোন কাজ নেই যা ধর্ষণের সাথে ঘটছে না।
এরকম ঘটনা অনেকগুলোই ধামাচাপা পড়ে যায়। আবার প্রভাবশারীদের চাপে কখণও তা আলোর মুখই দেখে না। এমনও হয়েছে যে একাধিক ব্যক্তির ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যাবার পরেও তার উপর চলেছে পাশবিকতা। আবার মৃত নারীকে কবর থেকে তুলেও ধর্ষণ করার ঘটনা ঘটেছে।
এক্ষেত্রে দলের লোকজন, শিক্ষক, গ্রাম্য মাতব্বর, বাড়ির মালিক, মালিকের পুত্র, অফিসের বস, মাদ্রাসার শিক্ষক, ইমাম, মুয়াজ্জ্বিন, ফাদার, পুরোহিত, বখাটে, ব্যর্থ প্রেমিক সব শ্রেণির লোকই ধর্ষণের সাথে জড়িত। কিছুতেই থামছে না এই নারকীয় কান্ড।
জ্বর কখনোই কোন সুস্থ্য দেহে আসে না। শরীরের উচ্চ তাপমাত্রাই বলে দেয় দেহে ম্যালেরিয়া, নিউমনিয়া, টাইফয়েড, কভিড বা অন্য কোন মারাত্মক ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। জ্বর নিজেই কোন রোগ নয়, রোগের লক্ষণ মাত্র। তেমনি চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় অপরাধগুলোও কোন চরিত্রবান মানুষের জীবনে দেখা যায় না। এগুলো দেখা দিলে বুঝা যায়, আক্রান্ত ব্যক্তির নৈতিক ব্যাধিটি কতটা তীব্র।সে তীব্র নৈতিক ব্যাধি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার কারণেই বাংলাদেশ এ শতাব্দীর শুরুতে পর পর ৫ বার দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে প্রথম হয়েছিল। এখন ইতিহাস গড়ছে চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় মারাত্মক অপরাধে। দেশেটির এ গভীর দুর্দশা যে কোন বিবেকমান ব্যক্তিকেই ভাবিয়ে তুলতে বাধ্য।
প্যারাসিটামল খাওয়ালে জ্বর কমে যায়, কিন্তু তাতে রোগ সারে না। রোগ সারাতে হলে সঠিক রোগনির্ণয় জরুরী এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা জরুরী। তাই দেশে ধর্ষণের ন্যায় অপরাধ দমাতে হলে প্রথম জানতে হয় ধর্ষণ কেন হয় এবং সে কারণগুলি জানার পর সেগুলির মূলোৎপাটন করতে হয়। ধর্ষণ একটি ভয়ানক নৈতিক ব্যাধি। দৈহিক ও নৈতিক সত্ত্বার যোগফলেই মানুষ। খাদ্য-পানীয়তে দেহ বল পায় বটে, কিন্তু নৈতিক বল বাড়াতে হলে চাই জ্ঞান। চাই পরকালের ভয়। সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে যখন চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় অপরাধে প্লাবন আসে তখন বুঝা যায় সে সমাজে জ্ঞানদানের কাজটি যথাযত হয়নি। পরকালের ভয়ও তেমন স্থান পায়নি। শুধু স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়লেই জ্ঞানদান হয় না এবং চরিত্রও গড়ে উঠে না। ডিগ্রিদান ও জ্ঞানদান এক কথা নয়। বরং দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কতজন অসভ্য মানুষকে সভ্য করলো, কতজনের চরিত্রে নৈতিক বল যোগ করলো এবং কতজনকে পাপাচার থেকে ফিরালো -তা দিয়েই বিচার হয় শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য। এক্ষেত্ত্রে বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ব্যর্থতা বিশাল। অতিশয় পরিতাপের বিষয় হলো, অসভ্য মানুষকে সভ্য করা, চরিত্রে নৈতিক বল জোগানো, ও পাপাচার থেকে ফিরানো বাংলাদেশের শিক্ষানীতির আদৌও কোন লক্ষ্য নয়।
শিক্ষকগণ মনে করেন, প্রাথমিক স্তরে লিখতে, পড়তে ও হিসাব কষতে শেখানোই তাদের মূল দায়িত্ব।কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায়ে দেয়া হয়, কারিগরি, চিকিৎসা, কৃষি, আইন শাস্ত্র ও ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের ন্যায় নানা বিষয়ে জ্ঞান। কিন্তু কোথাও চরিত্রে নৈতিক বল জোগানো, ও পাপাচার থেকে ফিরানোর কোন আয়োজন নাই। ফলে ব্যর্থতাগুলিও বিশাল। দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় অপরাধের সাথে যারা জড়িত তাদের কেউই মুর্খ বা নিরক্ষর নয়। তারা বন জঙ্গল বা ক্ষেত-খামার থেকেও উঠে আসেনি। তাদের সবাই স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তারা সার্টিফিকেট পেলেও বেড়ে উঠেছে মারাত্মক নৈতিক অপুষ্টি নিয়ে। তাদের মাঝে সৃষ্টি হয়নি পরকালের ভয়।
মানব শিশুকে মানব রূপে বেড়ে উঠতে হলে সব সময় বাঁচতে হয় এক পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এ পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার গুরুত্ব বুঝাতে মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আশ শামসে ৭ বার কসম খেয়েছেন। পবিত্র কোর’আনের আর কোথাও মহান আল্লাহতায়ালা এভাবে একের পর এক সাতবার কসম খাননি। কসম শেষে ঘোষণা দিয়েছেন, “ক্বাদ আফলাহা মান যাক্কাহা।” অর্থঃ সে ব্যক্তিই নিশ্চিত কল্যাণ পেল যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করলো। এ পরিশুদ্ধিটি বস্তুতঃ ব্যক্তির আত্মিক, নৈতিক, চারিত্রিক ও কর্মের পরিশুদ্ধি। এ পরিশুদ্ধি করণ প্রক্রিয়াকে আরবীতে বলা হয় তাহজিব। ব্যক্তির জীবনে এ পরিশুদ্ধি খাদ্য,পানীয় বা সম্পদে আসে না, আসে ধর্মীয় জ্ঞানে, নৈতিক শিক্ষায়। যান্ত্রিক পরিশুদ্ধির মাধ্যমে ক্ষেতের আঁখ চিনিতে পরিণত হয়; তেমন কোর’আনী জ্ঞানের মধ্য দিয়ে যে পরিশুদ্ধি আসে তাতে একজন জাহেল ব্যক্তিও ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারে।
আমাদের দেশেেএখন যৌনতায় উস্কানী দেয়ার সামগ্রীও যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান। কিন্তু নাই চেতনায় পুষ্টি বা পরিশুদ্ধি জোগানোর সামগ্রী। ফলে বাঙালীর জীবনে মানব রূপে বেড়ে উঠায় রয়ে গেছে বিশাল ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বেদনাও ছিল গভীর। তাই লিখেছেন, “হে বিধাতা, ৭ কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি।”
সর্বপ্রকার অপরাধ রোধ ও গণজীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্বটি সরকারের। সশস্ত্র ডাকাত, খুনি বা ধর্ষক দলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সামর্থ্য কোন ব্যক্তিরই থাকে না। এ কাজটি বিশাল। এরূপ অপরাধীদের দমনে প্রতিটি সভ্য দেশেই বিশাল পুলিশ বাহিনী থাকে। থাকে প্রশাসন। থাকে আদালত। অথচ বাংলাদেশে সঠিক ভাবে কাজ করছে না এর কোনটিই। অথচ তাদের পালতে বিপুল অর্থের রাজস্ব দেয় জনগণ। বাস্তবতা হলো, কোন সভ্য দেশও অপরাধ মুক্ত নয়। এমন কি নবীজী (সাঃ)র আমলে অপরাধ হয়েছে। কিন্তু পার্থক্য হলো, প্রতিটি সভ্য দেশে সে অপরাধের শাস্তিও হয়েছে। কিন্তু অসভ্য দেশে সেটি ঘটে না। এজন্যই পবিত্র কোর’আন শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের বিধানই দেয় না, দেয় চোরদের হাত কাটা এবং খুনি ও ধর্ষকদের হত্যারও নির্দেশও।
দৈহিক ভাবে বাঁচার জন্য নিয়মিত খাদ্য চাই। তেমনি খাদ্য চাই নৈতিক পুষ্টির জন্যও। নৈতিক পুষ্টির সে সেরা খাদ্যটি হলো ওহীর জ্ঞান তথা পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান। সেআসাথে নীতিকথা, সামাজিকতা, আর ছোট-বড়র আদব কায়দার বড়ই দরকার। মানবকে মানব রূপে বেড়ে উঠার জন্য মহান আল্লাহতায়ালা স্রেফ নানারূপ খাদ্যই দেননি, দিয়েছেন লক্ষাধিক নবী-রাসূলের মাধ্যমে ওহীর জ্ঞান। কোর’আন হলো ওহীর জ্ঞানের সর্বশেষ গ্রন্থ। এ জ্ঞান যেমন জান্নাতের পথ দেখায়, তেমনি বাঁচায় জাহান্নামের আগুন থেকেও। সৃষ্টি করে পরকালে জবাবদিহিতার ভয়। এবং সামর্থ্য জোগায় মানবিক গুণে বেড়ে উঠাতেও। প্রতিটি নরনারীর উপর ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার বা বিজ্ঞানী হওয়া ফরজ নয়। ফরজ নয় এসব বিষয়ে জ্ঞান হাসিলও। কিন্তু প্রত্যেকের উপর নামায-রোযার ন্যায় যা ফরজ তা হলো পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানার্জন। অক্সিজেন ছাড়া যেমন দেহ বাঁচে না, তেমনি কোর’আনের জ্ঞান ছাড়া ঈমানও বাঁচে না। তখন অসম্ভব হয় যেমন মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা, এবং অসম্ভব হয় পাপাচার থেকে বাঁচা। সমাজ তখন পাপাচারি দুর্বৃত্তদের দিয়ে ভরে উঠে। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে। পুলিশ দিয়ে বা কিছু লোককে ফাঁসি দিয়ে এ নৈতিক ব্যাধি থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। এ রোগের চিকিৎসায় আরো গভীরে যেতে হয়। বাঁচাতে হয় ব্যক্তির বিবেককে।
ধর্মের মর্মকথা বিলুপ্তির সাথে আমাদের পাঠ্যসূচিতে নেই আর আগের সেই নীতিকথামূলক লেখা। এখন বাচ্চাদের আর কবিতা মুখস্ত করতে হয় না। লিখতে হয়না দশ লাইনও। পলে তাদের সৃজনশীলতা যাচ্ছে কমে। ছোট সিলেবাস আর টিকের যুগে এখন জিপিএ ৫ পাওয়া একজন শিক্ষার্থীও তার পাঠ্য বইয়ের একটি কবিতা পুরো বলতে পারে না। ফলে কবিতার মর্মবাণীও তাদের হৃদয়ে কোন দাগ কাটে না। নিষ্ফলা সাহিত্য তাকে যথার্থ বেড়ে তুলছে না। নেই মান্য করার বালাই। সব সময় শুধু ছোটরা পাচ্ছে ভয়, আর ধমকের ছবক। আর বড় হচ্ছে নানী-দাদীর, চাচা-চাচী, ফুফুর আদর স্নেহ ছাড়া বিদেশি কালচার দেখে ও শুনে। তাদের বিনোদনের খোরাক, টিভি সেট, মোবাইল ফোন এসব। আর এর মধ্যে একবার ডুব মারলে জগতের কোন খোঁজ-খবর নেবার মতো অবস্থায় থাকেনা বাচ্চারা। পরস্পর মেলামেশার মধ্যেও নেই কোন শালিনতা। এসবের কারণে ক্রমান্বয়ে পচন ধরছে আমাদের সামাজিকতার শিকড়ে।
ফলে একটু বড় হবার সাথে সাথেই বিদেশী সংস্কারে নীতি নৈতিকতা ভুলে আজকের শিশুই হয়ে উঠছে একজন ধর্ষক, অথবা হচ্ছে ধর্ষিতা। এমনি করে চলছে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা। তাই সরকারকে এখনই বাস্তবতা বর্জিত সিলেবাস , কর্মকান্ড আর কালচারকে না বলতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে তিন চার পৃষ্ঠা লেখার সিলেবাস। যাতে করে বাচ্চারা অনেকটা সময় ধরে পাঠে মনোযোগী থাকে। এখনকার বাচ্চারা পরীক্ষার আগের রাতেও ঘুরে বেড়ায়। বললে উত্তর দেয় কি পড়বো। সবতো সৃজনশীল। কি আসবে বলা যায়না। তাই পড়ি না। কবিতা মুখস্ত করা লাগে না।নীতিকথায় কোন মার্কস নেই । ফলে তা পড়ার দরকার হয়না।
তাই আমি মনে করি ধর্ষণের দর্শণ থেকে বের হয়ে আসতে প্রথম প্রয়োজন সময়োপযোগী শিক্ষা। বাইরের দেশের দেখে আমাদের টিক দ্বারা নম্বর পেয়ে পাশ করা শিক্ষার্থীদের মানসিকতায় কখনই বাবা-মা, ভাইবোন, দাদা-দাদী, নানা-নানীর আদর সোহাগ , ওস্তাদের সম্মানবোধ, কোন কিছুই এখন আর নাগালের মধ্যে নেই। হয় নিজেরা, না হয় তাদের পিতা-মাতা, না হয় সমাজ ব্যবস্থা, না হয় তাদের পারিপাশ্বিক অবস্থা এসব থেকে তাদের বঞ্চিত করছে। ফলে তারা একটু বড় হয়ে নৈতিকতাহীন সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছে। এসব কারণেই আজকের সমাজে ধর্ষণের মহামারি করোনাকেও ছাপিয়ে পত্রিকার হেডলাইন হচ্ছে। এই মহামারির কি কোন ট্যাবলেট আবিস্কার করা যাবে? যদি না যায় তাহলে কি বিবেকবোধ সম্পন্ন পদ্ধতির গোড়া পত্তন এই সমাজে করা যায় –এ বিষয়ে ভাবার সময় কি এখনও আসেনি? ভাববেন কি? প্রশ্ন রয়ে গেলো।
ঠিকানা : অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
মোবাইল : ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
ইমেল : info@sirajganjkantho.com