শিরোনামঃ
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, তাড়াশ ১২-১০-২০২০ ০৬:৫১ অপরাহ্ন |
আশরাফুল ইসলাম রনি:
ষড়ঋতুর দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। এই বাংলার ভাদ্র-আশ্বিন দুই মাস নিয়ে শরৎকাল। এই শরৎকালে বিলাঞ্চলে বেড়াতে গিয়ে বেশ আনন্দ হয়। বিলাঞ্চলের উচু অনাবাদী জমিতে কাশফুল গুলো দিনভর দোলে। কাশ বনের পাশ দিয়ে যদি রেলগাড়ী যেতে দেখেন তাহলে তো কথাই নেই। তখন মনের কোনে জেগে উঠবে কাশের বনে ঢেউ খেলে তুফান মেলে যায়-তুফান মেলে যায়- গানের কথাগুলো আর এই শরতে বেড়ানোর জন্য চলনবিলের তাড়াশ-গুরুদাসপুর-ভাঙ্গুড়া কিংবা এর আশপাশের এলাকাগুলো বেছে নিতে পারেন। শরতে চলনবিলের সিরাজগঞ্জের তাড়াশের রুপের যে নেই তুলনা। গাছে গাছে কতনা ফুল, কামীনি, কদম, শিউলী, হাসনাহেনা ফুটে শুগন্ধ ছড়াচ্ছে দিনে রাতে সমানে। শরতে ছায়া ঢাকা মায়া-মাখা তাড়াশ যেন একখানি ছবি। ছবির মত রুপ দেখে হয়তো আপনার মনে পড়ে যাবে। হেরুনী শারদ প্রভাতে হে মাত বঙ্গ। শ্যামল অঙ্গ/ঝোলিছে অমল শোভাতে /পারে না বহিতে নদী জল ভার/মাঠে মাঠে ধান ধরে নাক আর/ডাকিছে দোয়েল গাহিছে কোয়েল/তোমার কানন শোভাতে কবিতার ই চরণগুলো।
এছাড়া তাড়াশের আশ-পাশে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী,খালবিল। এ সবই বয়ে গেছে চলনবিলের উপর দিয়ে। শরতে চলনবিলে যেন জলে থৈ-থৈই চারিদিকে পালতোলা নৌকা চলেছে। দেখতে অসাধারণ এক দৃশ্য। আকাশ কখনো মেঘলা কখনো সাদা রং ধারণ করে। আত্রাই,গুড় নদী, বরনাই নদী,বড়াল নদী, তুলসী নদী, চেচুয়া নদী, ভাদাই নদী, গুমানী নদী এসব নদীগুলো বয়ে গেছে চলনবিলের ওপর দিয়ে। মেঘ গর্জন করলেই-অঝর ধারায় নেমে বর্ষনধারা। তখন নৌকা ভাড়া করে , বহু দুরে চলে যেতে পারেন। এ ভাবে বেড়াতে চাইলে কয়েক বন্ধু বা পরিবার মিলে গেলে ভাল হয়। চলনবিলে নৌকায় করে ৩ থেকে ৪ রাত কাটিয়ে দারুন আনন্দ উপভোগ করা যায়। নৌকা যখন কোন কোলে এসে ভীড়বে,তখন দেখবেন সাদা কাশফুল। সুযোগ পেয়েছে কাশেরা,পুরো এলাকা জুড়েই বসতি গেড়েছে। কাশবনে পাখিরা সারা আড্ডা দেয়। মন তখন আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠে। হয়তো মনে জেগে উঠবে ’বরষার জল সরিয়া গিয়াছে জাগিয়া উঠেছে চর-গাঙচিল-শালিকেরা গর্ত খুড়িয়া বাধিতেছে সবে ঘর/গহীনে নদীর দুই পার দিয়া আখি যায় যতদুরে/আকাশের মেঘ অতিথি যেন গো-তাহার আঙ্গিনা জুড়ে” কবিতার এই চরণগুলো। ৩ থেকে ৪ দিনের জন্য নৌকা ভাড়া নেবে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। আর রান্না বান্না হবে নৌকাতেই। সে কি আনন্দ। শরতে আকাশ মেঘলা হযে উঠলে তো বৃষ্টি নেমে আসবেই। তখন বিলের রুপ যেন অপরুপ হয়ে ওঠে। যদি কোন তীওে নামা যায় তখন মাটিতে পা রেখে কাছ থেকে দেখা শিউলী ফুল। আহা-তখন তো মনে পড়বেই, আমরা বেধেছি কাশের গুচ্ছ,আমরা গেথেছি শেফালী মালা, নবীন ধানের মঞ্জুরী দিয়ে সাজায়ে এনেছি বরণডালা...কবিতার এই কথাগুলো।
তাড়াশে দর্শনীয় স্থানগুলোর অভাব নেই। এখানকার অন্যতম আকর্ষন হলো-রাধা গোবিন্দ মন্দির, শীব মন্দির,মথুরা দিঘী, বড় কুঞ্জবন, উলিপুরের দিঘী, শিশু পার্ক, বৌদ্ধ বিহার। এ সব ঘুরে ঘুরে দেখতে খুব ভাল লাগবে। শরতের শেষের দিকে শুরু হয় দুর্গাপুজা। তখনতো এখানকার গোবীন্দ মন্দিরে বাজে অবিরাম ঢোল-বাদ্য, আকাশে ওরে রঙ্গিন ফানুষ। কীর্তন গানে মূখরীত পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস। আর তাড়াশে চারিদিকে ফুটে থাকে কত না কাশফুল। তাড়াশে বেড়াতে এসে জানা যাবে এখানকার বিখ্যাত কপ্লিশ্বের শীব মন্দির, দেবী মন্দির, বাসুদেব ও গোপীনাথ বিগ্রহের মন্দির এর কাহীনি। তাড়াশের রাজ বংশের পুর্ব পুরুষ বলরাম প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি মন্দির, থানা রোডে কুঞ্জবন নামক সর্ববৃহৎ জলাশয় ও তাড়াশের রাজবাড়ীর ধ্বংসবশেষ প্রাচীন কৃীর্তির নির্দশন। তাড়াশে ভগ্নপ্রায় জোরবাঙ্গালার গায়ে ১৬৬১ খিষ্টাব্দের খোদিত লিপি থেকে জানা যায়, এখানকার গোপীনাথ বিগ্রহের সেবায়েত ছিলেন নাগবংশীয় কায়স্থ। এই তাড়াশের বিনোদ রায়,গোবীন্দজী, রশিক রায়,কপিলেশ্বর শিব প্রভৃতি যে কয়েকটি বিগ্রহের মন্দির রয়েছে, এর মধ্যে কপিলেশ্বর ও গোবীন্দ মন্দির অন্যতম। আর এ সব দেখতে দেখতেই এক নিমিষেই ফিরে যাবেন অতীত যুগে। তখন স্মৃতিতে ভেসে উঠবে হয়তোবা পুজা পার্বণের সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা। দেখবেন এখানকার প্রতিটি মন্দিরের গায়ে রয়েছে অপরুপ কারুকাজ। প্রাচীনকালে ক্ষুদ্র ইট দিয়ে এসব মন্দির তৈরি হয়েছিল। আরেকটি বিষয় হলো চলনবিলের তাড়াশে গিয়ে কৌতুহল জাগবে তাড়াশের নামকরণ নিয়ে যে কিভাবে তাড়াশ নামটি নামকরন হলো- এক সময় তাড়াশের নাম শুনেই মনে ত্রাস বা তরাসের সৃষ্টি হতো। অনেকে ধারণা করেন, তরাস শব্দ থেকে তাড়াশ নামের উৎপত্তি হয়েছে। তাড়াশের পাশে (প্রাচীন কালের নাম ছিল চান্দেরগাও) বর্তমানে বিনসাড়া গ্রাম। রিক্সাভ্যান করে যেতে পারেন সময় লাগবে ১০ থেকে ১৫ মিনিট। সেখানে জানতে ও দেখতে পাওয়া যাবে বাংলার কিংবদন্তী বেহুলা সুন্দরীর বাবা বাছো বানিয়া ওরফে সায় সওদাগরের বাস ছিল যে তার স্মৃতিময় কালের স্বাক্ষীয় দর্শনগুলো। সেখানে গিয়ে কয়েকটি কুপ দেখা যাবে।
একটি কুপের নাম জীয়ন কুপ। এই কুপটি বড় অদ্ভুদ ধরনের। বড় বড় ইটের গাথুনী দিয়ে এটি নির্মিত। যার একটি কুপের মধ্যে আরো ৩ টি কুপ। ওখানে গিয়ে লোকমূখে আরো জানা যাবে বাছোবানীয়া ছিলেন মনসা পুজারী। দুধ পুকুর নামে তার একটি পুকুর ছিল। পুকুরটি নাকি সাপ”দের জন্য দুধে ভর্তি থাকতো। এখনো আছে সেই পুকুর কিন্তুু সেখানে দুধও নেই সাপ নেই।
এ বিষয়ে তাড়াশ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বাবুল শেখ বলেন, চলনবিলকে শরৎকালে উপভোগ করার মত রয়েছে নানা দর্শনীয়স্থান। বর্ষাকালে নৌকা ভ্রমন পিয়াসুদের জন্য চলনবিল একটা মনোমুগ্ধকর অঞ্চল। প্রতি বছররই বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসে চলনবিলে বেড়াতে।
ঠিকানা : অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
মোবাইল : ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
ইমেল : info@sirajganjkantho.com