শিরোনামঃ
আব্দুল জলিল ০৮-০৯-২০২০ ০৪:১৭ অপরাহ্ন |
স্টাফ রিপোর্টারঃ পদ্মা সেতু এলাকার চর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেছিল দুর্বৃত্তরা। সেতুর ক্ষতি হবে এমন বিবেচনায় মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক বালু উত্তোলন বন্ধ করে দেন। এরপর একজন প্রভাবশালীর প্ররোচনায় বালু উত্তোলনকারী মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুনের বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলা করে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন। পদ্মা সেতু যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য বালু উত্তোলন বন্ধ করে মামলা লড়েন জেলা প্রশাসক।
এ ঘটনার পর প্রশাসন ক্যাডারের সরকারি কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এসোসিয়েশন (বিএএসএ) বলছে, অসংলগ্ন কথাবার্তায় ভরপুরÑ এমন একটি আর্জির ভিত্তিতে একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে মামলা নজিরবিহীন। এভাবে যদি মামলা নেয়া হয় তাহলে জেলা প্রশাসন কী করে দায়িত্ব পালন করবে? গত বুধবার দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানমের ওপরে যে হামলা হয়েছে সেটিকেও পরিকল্পিত বলে জানিয়েছে বিএএসএ। এই ঘটনার পর মাঠ প্রশাসনের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে।
শুধু এই ঘটনাই নয়, মাঠ প্রশাসনে বহু ঘটনা ঘটে যার অধিকাংশই জানা যায় না। বহু কর্মকর্তা বালুমহাল থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করতে গিয়ে আহত হয়েছেন, মোবাইল কোর্টে হামলার শিকার হয়েছেন, অবরুদ্ধ হয়েছেন, অনৈতিক সুবিধা না দেয়ায় প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন, উচ্ছেদ করতে গিয়ে আক্রমণের শিকার হয়েছেন, জুয়া ও মাদক কারবারিদের দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়েছেন, মিডিয়ার ভুয়া নিউজের শিরোনাম হয়েছেন, তুচ্ছ ঘটনায় অপদস্ত হয়েছেন, অবৈধ কাজে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ঘেরাও বা মিছিলের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। তবু মাঠ প্রশাসন জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে।
জানতে চাইলে সরকারের সাবেক সচিব আবুল আবু আলম মো. শহীদ খান গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, একজন ইউএনওকে সরকার কিংবা রাষ্ট্রের হয়ে অনেক কাজ করতে হয়। এ কাজগুলো স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক নেতাদের পছন্দ নয়। তারা চান রাজনৈতিকভাবে প্রশাসন চালাতে। কেন এমটি ঘটছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিপর্যয় ঘটার কারণেই মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। রাজনৈতিকভাবে ছাত্র কিংবা যুব নেতাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বিষয়গুলো আরো বেশি ঘটছে বলে তিনি মনে করেন। এসব করে দেশকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এমন করে চলতে থাকলে কেউ কাজ করতে পারবে না বলেও জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা মূলত আটটি কারণে অস্বস্তি কিংবা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছেন। এর মধ্যে উন্নয়নকাজের ঠিকঠাক তত্ত্বাবধান, অংশীজনদের সমন্বয়, সুবিধাভোগীদের দূরে রাখা, অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভয় দেয়া, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, ধান-চাল কেনা, উপজেলা চেয়ারম্যান বনাম এমপির দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে প্রশাসন চালানো, রাজনৈতিক ফড়িয়াদের হাত থেকে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বাঁচানোর কাজ করেন জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা। কিন্তু এখন তারাই হামলার শিকার হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গত ১০ বছরে প্রশাসনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটা সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে প্রশাসনে পদোন্নতি, নতুন পে স্কেলের মাধ্যমে বেতন বাড়ানো এবং বিসিএসের মাধ্যমে নিয়মিত সরকারি চাকরিতে নিয়োগদানের ফলে সরকার প্রশাসনে শৃঙ্খলাও ফিরিয়ে এনেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে জনপ্রতিনিধি বা রাজনীতিবিদদের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে দ্বন্দ্ব সংঘাত ঘটানোর চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে, কোভিড-১৯ এর সময় থেকে এটা নতুন রূপে শুরু হয়েছে। কোভিড-১৯ এর শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রী সব দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রশাসনকে। এতে জেলায় জেলা প্রশাসক, উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তারা সবকিছুর নেতৃত্বে থেকেছেন। প্রশাসনকে দায়িত্ব দেয়ার ফলে বিভিন্ন রকম অনিয়ম, দুর্নীতি, চুরি বন্ধ হয়েছে, মানুষ ত্রাণ পেয়েছে ঠিকমতো। কিন্তু মাঠ প্রশাসনকে দায়িত্ব দেয়ায় রাজনীতিবিদরা মনোক্ষুণœ হয়েছেন। কারণ স্থানীয় রাজনীতিবিদের ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রই হলো ত্রাণ বিতরণ। সেই ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব প্রশাসনকে দেয়ায় রাজনীতিবিদদের কর্তৃত্ব কমে গেছে। এতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিবিদের টানাপড়েন শুরু হয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বিএএসএর সভাপতি হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, এই প্রথম দেখলাম, ইউএনওর বাসভবনে রাতে প্রবেশ করে ইউএনওকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে আঘাত করা হয়েছে। তখন তাদের নিরাপত্তার বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। তবে এটা ঠিক, নিরাপত্তার ঝুঁকি যারা তৈরি করে, তারা অনেকে রাজনীতিকে ব্যবহার করে। জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইঊসুফ হারুন বলেন, মানুষের চাহিদা অফুরন্ত হয়ে গেছে। চাহিদার কোনটা আইনি আর কোনটা বেআইনি তারা সেটা দেখেন না। বেআইনি কোনো আবদার করলে এবং সেটি মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বাস্তবায়ন না করলেই শুরু হয় অপদস্থ করার পালা।
কিছুদিন আগে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করে আসা বর্তমানে একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বরত একজন উপসচিব ভোরের কাগজকে বলেন, মাঠ প্রশাসনে মূলত ২ শতাধিক কমিটি রয়েছে। জেলায় এসব কমিটির প্রধান জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তাদের এসব সমন্বয় করে চলতে হয়। কিন্তু মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের বিরোধ কীভাবে শুরু হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হয়তো দেখা গেল একটি ব্রিজ নির্মাণ হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী ব্রিজ নির্মাণের কাজ ঠিকঠাকমতো হচ্ছে কিনা তা দেখার কথা ইঞ্জিনিয়ারের। কিন্তু পরিস্থিতি বা অন্য কোনো কারণে তিনি এটা দেখছেন না। ডিসি বা ইউএনও পরিদর্শনে গিয়ে দেখলেন, নি¤œমানের সামগ্রী দিয়ে ওই ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি কোনো ডিসি বা ইউএনও কাজটি বন্ধ করে ঠিকাদারের বিল আটকে দেন তখন ওই ঠিকাদার স্থানীয় প্রভাবশালীদের দিয়ে প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করে। কোনো কোনো ডিসি বা ইউএনও ওই চাপ উপেক্ষা করে কাজ করেন আবার কেউ কেউ চাপ সহ্য করতে পারেন না। তবে ব্যতিক্রমও যে কেউ থাকেন না তা নয়।
ইউএনও থেকে সদ্য এডিসি হওয়া একজন কর্মকর্তা প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয়দের দ্বন্দ্বের কয়েকটি কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, কেউ হয়তো বালু তোলার জন্য কোনো জমি লিজ নিল। অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে লিজ নিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রচুর টাকা খরচ হয়। সেই টাকা তোলার জন্য লিজ না নেয়া অংশ থেকেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বালু উত্তোলন করতে থাকেন। এতে বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষতি হয়। এসব কাজে এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যানের লোকজন জড়িত থাকেন। এখন এই অবৈধ বালু তোলা বন্ধ করতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হলে এরা ক্ষিপ্ত হন। এছাড়া সরকার এখন ধান-চাল কিনছে। আইন অনুযায়ী এখানে কৃষক বা ডিলারের কাছ থেকে কেনা হবে। কিন্তু কৌশলে স্থানীয় রাজনীতিকরা এটাতে ঢুকে যান। ঢুকে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন, সরকারের পক্ষে কাজ করলে স্থানীয় রাজনীতিকরা মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করবে আর না করলে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে সাবেক একজন জেলা প্রশাসক বলেন, রাষ্ট্র সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আচরণ বিধিমালা তৈরি করে দিয়েছে। কিন্তু রাজনীতিক কিংবা জনপ্রতিনিধিদের কোনো আচরণ বিধি তৈরি করে দেয়নি। যে কারণে রাজনীতিকরা এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে সরকারি কাজে হস্তক্ষেপ করেন। এই অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণেও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঠিকঠাকভাবে কাজ করতে পারেন না।
একটি উদাহরণ দিয়ে দেশের পূর্বাঞ্চলের একটি জেলায় দায়িত্ব পালন করে আসা একজন জেলা প্রশাসক বলেন, মাঠ প্রশাসনের বিরুদ্ধে স্থানীয় রাজনীতিকরাই কাজ করেন কথাটি ঠিক নয়। মাঠ প্রশাসনে এমন কিছু কাজ রয়েছে, আইন অনুযায়ী এসব কাজ করলে স্থানীয় রাজনীতিকরা কথা বলারই সুযোগ পাবেন না। তারা কথা বলার সুযোগ না পেয়ে মাঠ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ পাঠান কেন্দ্রীয় প্রশাসনে। কেন্দ্রীয় প্রশাসন এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ পেয়ে গভীরভাবে যাচাই-বাছাই না করেই মাঠ প্রশাসনের ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। তাতে করে মাঠ প্রশাসনে কর্মরতদের মনোবল ভেঙে যায়। স্বার্থান্বেষী মহল চাঙ্গা হয়ে উঠে।
এসব বিষয়ে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান রুহুল তার ফেসবুকে ‘রক্তে ভেজা মন’ শিরোনাম দিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তাতে তিনি লিখেছেন, যখনই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কোনোপ্রকার স্বার্থে আঘাত লাগে, কেউ কোনোভাবে অনৈতিক সুবিধা আদায়ে ব্যর্থ হয়, কোনো অন্যায় করে পার পেতে চায়, নিয়োগ, ইজারা বা ভিন্ন কোনো কাজে তদবির করে ব্যর্থ হয়, কখনো একাধিক গ্রুপ/দল/উপদলের আন্তঃসম্পর্কে প্রশাসনকে জড়িয়ে নিজেরা সুবিধা পেতে চায়, বিভিন্ন ধরনের ফায়দা লুটতে চেয়ে সুবিধা করে উঠতে পারে না, তখনই সেসব দুষ্কৃতকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, তাকে শত্রু মনে করে, নানারকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, বিভিন্নভাবে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে, নোংরা কোনো বিষয়ে জড়ানোর পাঁয়তারা করে, হুমকি-ধমকি দিয়ে স্বার্থ হাসিল করতে চায়, সম্মানহানির চেষ্টা চালায়, ভাড়াটে মিডিয়ায় বদনাম ছড়ানোর চেষ্টা করে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কুৎসা রটায়, উল্টাপাল্টা অভিযোগ দিতে থাকে, বদলি করানোর জন্য তদবির শুরু করে, মিছিল ঘেরাও মামলা-হামলা করে, এমনকি হত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করে। এসব কারণে কখনো কখনো প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে। এতে কেউ কেউ হয়তো হাল ছেড়ে দেন, কেউ হাল ধরে রাখতে চাইলেও দুষ্কৃতিকারীরা হাল ছাড়ে না, ওরা লেগে থাকে, যে কোনো মূল্যে ওদের স্বার্থ উদ্ধার করা চাই, উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা চাই, এভাবেই বাড়তে থাকে সমস্যা, এসব সমস্যা নিয়েই চলছে আমাদের মাঠ প্রশাসন। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট শুধু একটা ঘটনা নয়; এটা মাঠ প্রশাসনের সমস্যা ও দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। সূত্র- ভোরের কাগজ অভিজিৎ ভট্টাচার্য..
ঠিকানা : অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
মোবাইল : ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
ইমেল : info@sirajganjkantho.com