শিরোনামঃ
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, তাড়াশ ১৩-০৮-২০২০ ১২:৪২ অপরাহ্ন |
নিজস্ব প্রতিবেদক: সিরাজগঞ্জের তাড়াশে রিশান গ্রুপ অব কোম্পানী খুলেছেন উপজেলা যুবলীগের সহসভাপতি ও কোম্পনাীর চেয়ারম্যান ডি.জে শাকিল। আর এই কোম্পানীর আরেক শাখা হলো ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক লোন সার্ভিস সেন্টার (আইবিএল)। তিনি দেশ-বিদেশের ব্যাংক লোন কিংবা সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি, সবই দক্ষভাবে করিয়ে দিতে পারদর্শী । বড় প্রতিষ্ঠানের নামে মোটা অংকের ফান্ড লোন কিংবা বিদেশি বিনিয়োগ আনতে বিশ্বের ১৫টি দেশের ৩২টি ব্যাংকের স্বীকৃত ১১৫টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার রয়েছে চুক্তি। দেশে বেকারত্ব দূর ও উদ্যোক্তা তৈরি করতে তিনি দিচ্ছেন স্বল্প সুদে লোন করিয়ে দেয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা। সর্বনিম্ন ২০ লাখ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত লোন করিয়ে দিবে বলে প্রতারনার ফাঁদ পেতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের বোকা বানিয়ে লোন প্রসেসিং করার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অন্যতম এই কারিগর হলেন সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি ডি.জে শাকিল (৩২) ও তার অন্যতম সহযোগী আইটি বিশেষজ্ঞ রিশান গ্রæপ অব কোম্পানীর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হুমায়ুন কবির লিমন (২৮) ও ম্যানেজার হারুন রশিদ ওরফে সাইফুল ইসলাম (২৬)।
বুধবার বিকালে বগুড়া গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) একটি প্রতারনার অভিযোগে তাড়াশ পৌর এলাকার বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় তার অফিসে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- তাড়াশ উপজেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি ও বারুহাস গ্রামের কাজী গোলাম মোস্তফার ছেলে ডিজে শাকিল (৩২), কুসুম্বী গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে আইটি এক্সপার্ট হুমায়ূন কবির মিলন (২৮) ও নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার গাড়ীক্ষেত্র এলাকায় সাইদুর রহমানের ছেলে হারুন রশিদ ওরফে সাইফুল ইসলাম (২৬)।
বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, বগুড়ার ভুক্তভোগী দুই যুবকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বগুড়া সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর ইমরান মাহমুদ তুহিনের নেতৃত্বে একটি দল অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে। তাদের কাছে থেকে উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহকদের স্বাক্ষরিত টাকার অংক ছাড়া চেকের পাতা ১০টি, ৫শ কোটি টাকার পূবালী ব্যাংকের টাঙ্গাইল শাখার তাসবির এন্টারপ্রাইজের নামে ১টি চেক ও ৫ কোটি টাকার আরেকটি চেক ওই ব্যাংকের একই শাখার জাবের এন্টারপ্রাইজের নামে। এছাড়া একই শাখার ২শ কোটি টাকার আরও একটি চেক ইস্যু করা হয়েছে শিহাব উদ্দিন আহম্মেদের নামে। মোটা অংকের ব্যাংক লোনের আশায় তারিখ ছাড়া জামানত হিসেবে এই চেকগুলো প্রদান করেছেন পূবালী ব্যাংক টাঙ্গাইল প্রধান শাখার গ্রাহক (এসি নং : ০৪৭০৯০১০৪৪৬০৬) রাজলাক্সামি ট্রেডিং কর্পোরেশনের মালিক তাপস কুমার পাল। বাকি ১ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার টাকার চেকগুলো সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের রয়েছে।
বগুড়া ডিবি পুলিশের পরিদর্শক আসলাম আলী বলেন, অভিযানকালে ডি.জে শাকিলের সুসজ্জিত অফিস কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ১২০১ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার টাকার ভুয়া চেক, ৫০টির বেশি টাকার অংক ছাড়া স্বাক্ষর করা চেক, সামরিক বাহিনীসহ সরকারি একাধিক প্রতিষ্ঠানের ভুয়া নিয়োগপত্র ও চুক্তিনামা, জাল স্ট্যাম্প ও ড্যামি পেপার, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির ৬০টি সিম কার্ড, তাদের নিজস্ব পরিচালিত ২২টি অনলাইন নিউজ পোর্টালের তথ্য এবং আইডি কার্ড, দেশের সুনামধন্য বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ভুয়া নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ১২টি ফেসবুক আইডি, ৩৫টি ফেসবুক পেইজ, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সিলসহ চিঠি তৈরির ফরমেটসহ ২ টেরাবাইটের হার্ডডিস্ক, প্রিন্টারসহ ৩টি সিপিইউ ও ৩টি মনিটর এবং পূবালী ব্যাংকের সচল ৭টি ব্যাংক একাউন্ট।
অভিযোগ থেকে জানা যায়, আইবিএল ইন্টারন্যাশনাল লোন সার্ভিস থেকে চাকরি বার্তায় একটি বিজ্ঞাপন দেখে আকৃষ্ট হন বগুড়ার আমায়রা এগ্রো ফার্মের সত্ত্বাধিকারী আমানত উল্লাহ তারেক ও অভি এগ্রো ফার্মের সত্তাধিকারী আশিক দৌলাতানা।
তারা ডি.জে.শাকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে মোটা অংকের লোন করে দেয়ার কথা বলে প্রথম দফাতেই কমিশন বাবদ নগদ ১০ লাখ টাকা নেন তিনি।
এরপর তাদেরকে জানানো হয়, যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে তাদের নামে দুই কোটি ৫০ লাখ ও দুই কোটি টাকার পৃথক দুইটি লোন বরাদ্দ করা হয়েছে। এসব কথা বলে তাদের কাছে থেকে সর্বমোট সর্বমোট ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা আদায় করেন।
এরপর শাকিল তার নিজের অফিসের ইমেইল থেকে তারেকের ব্যক্তিগত জি-মেইলে ‘গনপ্রজাতন্ত্রী’ বাংলাদেশ সরকার যুব উন্নয়ন অধিদফতর লোন শাখার হিসাব নং- ০০০০০২৬৩৬৮১০৯৭, চেক নং- ক ৮৮৩৭৩৯২২৮৩৯২ তারিখ ১১/১১/২০১৯ইং আমায়রা এগ্রো ফার্মের নামে ২,৫০,০০,০০০/-(দুই কোটি পঞ্চাশ লক্ষ টাকা) ও আশিক দৌলাতানা অভির অভি এগ্রো ফার্মের নামে একই হিসাব নম্বরের অপর একটি চেক নং ক ৮৮৩৭৩৯২২৮৫৪৬৫৬, তারিখ ১১/১১/২০১৯ইং ২,০০,০০,০০০/-(দুই কোটি টাকা) সমমূল্যের ০২টি চেকের স্ক্যানকপি প্রেরণ করেন।
টাকা উত্তোলনের জন্য তারা শাকিলের কাছে চেকের মূল কপি চাইলে তারা আজ দেবে কাল দেবে বলে কালক্ষেপণ করে। বিষয়টিতে সন্দেহ হওয়ায় তারা বাংলাদেশ ব্যাংক, বগুড়া শাখায় গিয়ে চেক দুইটির প্রিন্ট কপি দেখালে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ বানান ভুল এবং চেক দুইটি ভুয়া বলে নিশ্চিত করে। এরপর তারেক পুনরায় যুব উন্নয়ন অধিদফতর, বগুড়া শাখায় গিয়ে শাকিলের প্রদত্ত লোন স্যাংশন লেটার ও চেকের স্ক্যান কপি দেখালে যুব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও স্যাংশন লেটার ও চেকের স্ক্যান কপিটি ভুয়া এবং স্বাক্ষর তাদের কর্তৃপক্ষের নয় বলে নিশ্চিত করে।
এ ব্যাপারে আমায়রা এগ্রো ফার্মের সত্ত্বাধিকারী আমানত উল্লাহ তারেক বলেন, শাকিল একজন প্রতারক। আমাদের সঙ্গে সে প্রতারণা করেছে। তার বিচার চাই।
বগুড়া গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানায়, সরকারি সিল মোহর ও প্যাড ব্যবহার করে তৈরি করা বেশ কিছু ভুয়া নিয়োগপত্র উদ্ধার করা হয় ডি.জে শাকিলের অফিস থেকে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজশাহীর বাঘমারার বাবুলুর রহমানের নামে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তৈরি মিটার রিডার কাম ম্যাসেনজারের ভুয়া নিয়োগপত্র, নাটোরের গুরুদাসপুরের আরিফুল ইসলামের নামে বাংলাদেশ রাজস্ব বোর্ডের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদের ভুয়া নিয়োগপত্র, বগুড়ার হাজরাদীঘি তেলধাপ গ্রামের নাজেম উদ্দিনের নামে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দফতরী কাম প্রহরীর ভুয়া নিয়োগ পত্র ও রংপুরের বদরগঞ্জের দক্ষিণ বাওচন্ডি গ্রামের চাঁদ বাবুর নামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিস সহায়ক পদের ভুয়া নিয়োগপত্র। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল জানিয়েছে একেকটি ভুয়া নিয়োগে সে ৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করেছে।
অভিযুক্ত ডি.জে শাকিল প্রতারণা বিষয়ে বলেন, আমি প্রতারণা করে নেয়া এসব টাকা বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্যের কাজে লাগিয়েছি। এখন আমার ভুল বুঝতে পারছি।
ঠিকানা : অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
মোবাইল : ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
ইমেল : info@sirajganjkantho.com