শাহজাদপুরে ডিলারের নামে দশ টাকা কেজি চালের কার্ড, উপজেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক রহস্যজনক কারণে নিরব!
০৩ মে, ২০২৬ ০৬:১২ অপরাহ্ন

  

শাহজাদপুরে ডিলারের নামে দশ টাকা কেজি চালের কার্ড, উপজেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক রহস্যজনক কারণে নিরব!

দিলীপ গৌর
১২-০৬-২০২০ ০৫:৩৯ অপরাহ্ন
শাহজাদপুরে ডিলারের নামে দশ টাকা কেজি চালের কার্ড, উপজেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক রহস্যজনক কারণে নিরব!

শাহজাদপুর  প্রতিনিধি : ধনির গরুর পেটে যাচ্ছে গরিবের ১০টাকার চাল। আর করোনা মহামারিতে চাল না পেয়ে গরিব না খেয়ে মরছে। এমন ঘটনাই ঘটেছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার গাড়াদহ ইউনিয়নে। গত কয়েকদিন ধরে এ উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিক্রিতে নানা অনিয়ম ও দূর্ণীতির অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগ থেকে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যই উঠে এসেছে। জানা যায়, এ দূর্ণীতির মধ্যে রয়েছে,অদক্ষ ও দলীয় ব্যক্তিদের ডিলারশীপ প্রদান,স্বচ্ছল ও চাকুরীজীবিদের নামে কার্ড বরাদ্দ ও নিজস্ব ঘর নেই অধিকাংশ ডিলারের।

এ ছাড়া গাড়াদহ ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের আওরঙ্গজেব নামের এক ডিলারের নামেও রয়েছে এ খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০টাকা কেজি দরের চালের কার্ড। তার কার্ড নং ১৯৫৮। তিনি গাড়াদহ ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি সেলিম হোসেনের ছোট ভাই ও নওশের আলীর ছেলে। অবিশ্বাস্য এ ঘটনা জানার পরেও শাহজাদপুর উপজেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক  ইয়াছিন আলী রহস্যজনক ভাবে নিরব ভুমিকা পালন করছেন। এ নিয়ে  স্থানীয় এলাকাবাসির মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেকে লিখিত অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছে না। উল্টো ডিলারদের লোকদের মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হচ্ছে।

এ বিষয়ে এলাকাবাসি জানায়,প্রতিটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা তাদের পছন্দের ব্যক্তি,আত্নীয়-স্বজন,ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি,সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০টাকা কেজি দরের চালের সুবিধা ভোগীদের তালিকা তৈরী করা হয়েছে। এরপর  সেটি উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হয়। সেটি সঠিক ভাবে যাচাই বাছাই না করে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করার পর তাদের নামে ওই কার্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এরপর ডিলালের মাধ্যমে ওই তালিকার ব্যক্তিদের কাছে এ চাল বিক্রি দেখানো হচ্ছে।

শাহজাদপুর উপজেলা খাদ্য অফিস সূত্রে জানা যায়,এ বছর শাহজাদপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে নতুন ২৬ জন ও পুরাতন ২৬জন মিলিয়ে মোট খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিক্রির জন্য ৫২ জন ডিলারকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর অধিকাংশ ডিলার রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গাড়াদহ ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের নওশের আলীর ছেলে আওরঙ্গজেব নামের এক ডিলারের নামেও রয়েছে ১০টাকা কেজি দরের চালের কার্ড নং ১৯৫৮। এ ছাড়া ওই ডিলারের ভাই ভাবি,ভাতিজা,চাচাতো ভাই,চাচাতো ভাইয়ের বউয়ের নামেও এ কার্ড রয়েছে।

এরা হল,নওশের আলীর ছেলে নূর কুতুবুল আলম(কার্ড নং ১৯৫১),বুলবুল আহাম্মেদ( কার্ড নং ১৯৫৪),চাচা নওয়াব আলীর ছেলে চাকরীজীবি গিয়াস উদ্দিন(কার্ড নং ১১৪২),আব্দুল কুদ্দুস(কার্ড নং ১১৪৩),আব্দুর রাজ্জাক(কার্ড নং ১১৪৫),সিরাজুল ইসলাম(কার্ড নং ১১৪৬),নওয়াব আলীর নাতি ও গিয়াস উদ্দিনের ছেলে জাকারিয়া(কার্ড নং ১১৪৪),কোটিপতি ধর্ণাঢ্য গার্মেন্টস ব্যবসায়ী হাজি শামসুল ইসলামের স্ত্রী হাজি সেলিনা বেগম( কার্ড নং ১১৩৯),তার ভাই ধর্ণাঢ্য ওষুধ ব্যবসায়ী দ্বিতলা পাকা ভবনের মালিক ইকবাল হোসেনের স্ত্রী ফিরোজা বেগম(কার্ড নং ১১১৩),ধর্ণাঢ্য আজিজুল হকের স্ত্রী মতিয়ারা বেগম (কার্ড নং ১১৫৪),ওনার ৩ ছেলে সরকারি চাকরিজীবি,ধর্ণাঢ্য আশরাফ আলীর স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা (কার্ড নং ১৯৫৭),আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী রুবিয়া বেগম(কার্ড নং ১১৫৫),হেলথ ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলামের স্ত্রী সোনিয়া ইসলাম (কার্ড নং ১১৫৬),গাড়াদহ ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি নাসির উদ্দিনের স্ত্রী তানজিলা (কার্ড নং ১১৩৮)।

এ নিয়ে ওই এলাকায় রীতিমত হৈচৈ পরে গেছে। তারপরেও শাহজাদপুর উপজেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক রহস্যজনক ভাবে নিরব ভুমিকা পালন করছেন। এ ছাড়া নতুন ৫২ জন ডিলার কোন না কোন ভাবে ক্ষমতাশীন দলের সাথে যুক্ত। তাদের ব্যবসায়ীক কোন ধারণা না থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় তাদের ডিলারশীপ দেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছল পরিবারের সদস্য,বিধবা ও বয়স্কভাতার সুবিধা ভোগী ও সককারি চাকরিজীবি বাদ দিয়ে এ খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিক্রির কার্ড তৈরীর তালিকা প্রস্তুতির সরকারি নির্দেশ থাকলেও প্রতিটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে দলীয় বিবেচনা ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে এ তালিকা প্রস্তুত করেছেন। আর নেপথ্যে থেকে স্বয়ং খাদ্যনিয়ন্ত্রক তাদের এ কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। এ কারণে ধর্ণাঢ্য,পেনশনভোগী,সরকারি ও আধা সরকারি চাকরিজীরাও এই ১০ টাকা কেজি দরের চাল তাদের নামের কার্ডের মাধ্যমে পাচ্ছেন।


এ বিষয়ে গাড়াদহ ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক হতদরিদ্র ব্যক্তি অভিযোগ করেন, আওরঙ্গজেব নামের ওই ডিলার তার নিজের নামের দশ টাকা কেজি দরের চালের কার্ড দিয়ে চাল উত্তোলন করে কালোবাজারে অধিক দামে বিক্রি করছেন(কার্ড নং ১৯৫৮)। বিষয়টি গাড়াদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ জেনেও এখনও এর কোন ব্যবস্থা নেননি। এছাড়া সরকারি চাকরি করছেন এমন একাধিক ব্যক্তির নামে কার্ড রয়েছে। বিদেশে চাকরি করেন এমন পরিবারের সদস্যের নামেও রয়েছে এ কার্ড। এ কার্ডের নামের তালিকায় রয়েছে গাড়াদহ ইউনিয়নের ৪,৫,৬নং সংরক্ষিত মহিলা আসনের মেম্বর নাজমা খাতুন (কার্ড নম্বর ১১৬২) তার ছেলে নাজমুল হোসেন (কার্ড নং ১১৬২)। প্রকৃত অসহায় পরিবারের সদস্যদের পরিবর্তে স্বচ্ছল ও ক্ষমতাশীল দলের লোকদের নামে ১০টাকা দরের চালের রেশন কার্ড করে দেওয়ায় স্থানীয় অসহায় পরিবারের মাঝে চরম ক্ষোভ তৈরী হয়েছে।


এ বিষয়ে ডিলার আওরঙ্গজেব বলেন,গাড়াদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম ও মেম্বরগণ মিলে এ তালিকা তৈরী করেছেন। এর দায়ভার সম্পূর্ণ তাদের। আমি শুধু তালিকা অনুযায়ী চাল সরবরাহ করে থাকি। আর এ তালিকা আমাকে উপজেলা খাদ্য অফিস থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে চাল সরবরাহে কোন অনিয়ম দূর্ণীতি হয়নি।এ বিষয়ে গাড়াদহ ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের রিপন হোসেন নামের আরেক ডিলার জানান,ধর্ণাঢ্য ব্যক্তিরা জোর করে তাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেছে। তারা এ চাল নিয়ে তাদের গরুকে ভাত রেধে খাওয়ায়। অধিক দুধ উৎপাদন ও গরু মোটাতাজা রাখতে তারা এ কাজ কওে থাকে। 


এ ব্যাপারে গাড়াদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন,তার ইউনিয়নে ৪ জন ডিলার রয়েছে। দুই একজন বিশেষ সুবিধা নিলেও ১০ টাকা চাল বিক্রিতে কোন অনিয়ম হচ্ছে না।এ ছাড়া কৈজুরি ইউনিয়ন কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক রাজিব  আহম্মেদ বলেন,কৈজুরি ইউনিয়নের প্রতিটি ডিলারের কাছে ১০টাকা কেজি দরের ৫০ থেকে ৬০ বস্তা চাল মজুদ রয়েছে। এ চাল বিতরণ না করে কালোবাজারে বিক্রির চেষ্টা চলছে। তাই আমরা রাত জেগে চালের গুদাম পাহাড়া দিচ্ছি। যাতে তারা এ চাল কালোবাজারে বিক্রি করতে না পারে। গরিবের এ চাল কালোবাজারে বিক্রির চেষ্টা করা হলে তা পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন,শুধু কৈজুরি ইউনিয়নেরই নয়,এ উপজেলার সব গুলো ইউনিয়নের এই একই অবস্থা। তারা ধরা পড়লে বলে,কার্ডধারিরা চাল না নেওয়ায় গুদামে চাল রয়ে গেছে। আর কালোবাজারে বিক্রি করতে পারলে তো সেটা বেমালুম হজম হয়ে যায়।


এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক মো.ইয়াছিন আলী বলেন,শাহজাদপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে এখন ৫২ জন ডিলালের মাধ্যমে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিক্রি করা হচ্ছে। এ ৫২ জন ডিলালের মধ্যে নতুন করে ২৬ জন ডিলারকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর আগে অনিয়ম-দূর্ণীতির অভিযোগে ৫ জনের ডিলারশীপ বাতিল করা হয়। তিনি আরো বলেন,  ডিলার আওরঙ্গজেব কোন অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহ মো.শামসুজ্জোহা বলেন,ডিলার আওরঙ্গজেবের অনিয়মের বিষয়টি জেনেছি। খোজ খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

 


দিলীপ গৌর ১২-০৬-২০২০ ০৫:৩৯ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 313 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com