হান্নান মন্ডলের প্রতারনার শিকার হয়ে শতাধিক মানুষ দিশেহারা
১৬ মে, ২০২৬ ১২:৪৯ অপরাহ্ন

  

   শিরোনামঃ

হান্নান মন্ডলের প্রতারনার শিকার হয়ে শতাধিক মানুষ দিশেহারা

স্টাফ করেস্পন্ডেন্ট, সিরাজগঞ্জ
০৩-০৩-২০২০ ০৯:৪২ অপরাহ্ন
হান্নান মন্ডলের প্রতারনার শিকার হয়ে শতাধিক মানুষ দিশেহারা

 প্রায় এক দশক ধরে প্রতারনা করে শতাধিক মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার ঘুরকা ইউনিয়নের লাঙ্গলমোড়া গ্রামের আব্দুল হান্নান মন্ডল। হান্নান ঐ গ্রামের মৃত জব্বার মন্ডলের পুত্র। 
যুগের কথার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আব্দুল হান্নানের প্রতারনা অনেক তথ্য। জানা যায়,পূর্ব পরিচয়ের সুত্র ধরে উল্লাপাড়ার এক ইট ভাটার মালিকের সখ্যতা গড়ে তোলে হান্নান। পরে তাকে জানায়,তার চাচা শ্বশুর সেনাবাহিনীর বড় কর্মকর্তা। তার চাচা শ্বশুরের তিন জাহাজ কয়লা বাঘাবাড়ি ঘাটে আসছে। তার কথায় বিশ্বাস করে উল্লাপাড়ার ইট ভাটার মালিক ও শাহজাদপুরের তালগাছির অন্য এক ইটভাটার মালিক ২০১৮ সালের প্রথম দিকে ৩৩০ টন কয়লার জন্য হান্নানকে ৪ কিস্তিতে ৩৩ লক্ষ টাকা প্রদান করে। কিন্তু সময়মত কয়লা না পাওয়ায় দুই ভাটা মালিক হান্নানকে চাপ দিলে সে ধানগড়া সোনালী ব্যাংক শাখার অনুকুলে ২৬ লাখ টাকার ৪টি চেক প্রদান করে। এর মধ্যে ৩৪০৪২৪১৮ হিসাব নাম্বারে এক লক্ষ টাকা,যার চেক নং ৩৫১০৯৯১, ৩৪০৪২৪১৭ হিসাব নাম্বারে তিন লক্ষ টাকা,যার চেক নং ৩৫১০৯৯২, ৩৪০৮২৪১৭ হিসাব নাম্বারের ৪ লক্ষ টাকা, যার চেক নং ৩৫১০৯৯৩, ৩৪০৪৩৪১৯ হিসাব নাম্বারে ১৮ লক্ষ টাকা,যার চেক নং ৩৫১০৯৯৪। কিন্তু দুই ভাটা মালিক ব্যাংকে টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারেন তাদের সাথে চরমভাবে প্রতারনা করা হয়েছে। এক লক্ষ টাকার যে চেকটি দেয়া হয়েছে সেই হিসাব নাম্বারটি সঠিক বাকী সকল হিসাব নাম্বার ইচ্ছে করে ভুল দেয়া হয়েছে। পাশ বহিতে হিসাব নাম্বারগুলি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের লিখে দেয়ার কথা,কিন্তু একই পাশ বই থেকে কিভাবে ৪টি হিসাব নাম্বার হলো তার কোন সদুত্তর ব্যাংক কর্মকর্তারা দিতে পারেনি। তবে তারা স্বীকার করেন,এর সাথে ব্যাংকের কোন কর্মকর্তারা জড়িত থাকতে পারেন। পরবর্তীতে শাহজাদপুরের ইট ভাটার মালিক শাহজাদপুর আদালতে আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে চেক প্রতারনার মামলা করেন। 
অনুসন্ধানে জানা যায়, আব্দুল হান্নান বিয়ে করেন পাবনার ঈশ্বরদীর জয়নগর গ্রামে বাচ্চু মন্ডল নামে এক চাল ব্যাবসায়ীর মেয়েকে। বাচ্চু মন্ডল বিয়ে করে কুষ্টিয়া আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ন সাধারন সম্পাদক মাহবুবুল হক হানিফ এমপির এক দুর আত্মিয়কে। ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর মাহবুবুল হক হানিফ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে দ্বায়িত্ব পায়। সেই থেকে ভাগ্য খুলে যায় আব্দুল হান্নানের। সে বিভিন্ন জায়গায় মাহবুবুল হক হানিফের ভাগ্নি জামাই পরিচয় দিয়ে নিয়োগ,বদলীসহ নানা অপকর্ম শুরু করে।  সেই সময় তাকে প্রায়ই সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের রুমে দেখা যেতো। পরবর্তীতে তার গ্রামের বাড়ি লাঙ্গলমোড়াতেও জেলা প্রশাসক,পুলিশ সুপারসহ উধ্বর্তন অনেক কর্মকর্তাকে যাতায়াত করতে দেখা যেতো। পরবর্তীতে জেলা পুলিশের কনষ্টেবল নিয়োগে আব্দুল হান্নানের মাধ্যমে এলাকায় কয়েকজনের চাকরী হয়। সেই সুত্র ধরে 
চান্দাইকোনা কলেজের শিক্ষক  ও হান্নানের বন্ধু আব্দুস সবুর বিপ্লব তার এক আত্মিয় ও কলেজের এক সহকর্মীর ছেলের কনষ্টেবল পদে চাকরীর জন্য ২০১১ সালে হান্নানকে ১৪ লক্ষ টাকা প্রদান করে। কিন্তু চাকরী না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে নানা তালবাহানা শুরু করে। পরে  হান্নান চার লাখ টাকার ঢাকা ব্যাংকের একটি চেক প্রদান করেন, চেক নং ৩০৪৬০৫০। বাকী ১০ লক্ষ টাকা এক মাস পরে দিবেন বলে ওয়াদা করেন। কিন্তু ব্যাংকে গিয়ে দেখেন হান্নানের হিসাবে কোন টাকা নেই। পরে হান্নানকে ধরলে সে বলে কদিন পর সব টাকা দিয়ে দিবে। কিন্তু প্রায় ১০ বছর অতিবাহিত হতে চললেও আজও টাকা ফেরত পায়নি বিপ্লব ও তার সহকর্মী। আব্দুস সবুর বিপ্লব বলেন, হান্নান মহা প্রতারক তাকে বিশ্বাস করে চরম ভুল করেছেন। তার সহকর্মী ঋন করে টাকা দিয়েছিলেন,কিন্তু দীর্ঘদিনের টাকা ফেরত না পাওয়ায় সুদ দিতে দিতে সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি। 
নিমগাছি ভাটারপাড়া গ্রামের স্কুল শিক্ষক ও আদিবাসী নেতা সুশিল মাহাতোর সাথে বন্ধুত্বের সুত্র ধরে ২০১১ সালে সুশিলের আত্মিয় স্বজন ৫ জনের কাছ থেকে কনষ্টেবল ও প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের জন্য ২৩ লক্ষ টাকা নেয়। কিন্তু চাকরী দিতে না পারায় টাকা ফেরত চাইলে হান্নান লাপাত্তা হয়ে যায়। হান্নানের বাড়িতে বিভিন্ন সময় ধর্না দিয়েও তার দেখা পায়নি ও সুশিল ও চাকরী প্রার্থিরা। সুশিল মাহাতো জানান, হান্নান তার বোন জামাই সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জুড়ান আলী ও ও বোন লিলি বেগম মিলে মানুষের কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করেছে। তারা এই টাকা উদ্ধারের জন্য প্রধানমন্ত্রী দৃষ্টি কামনা করেছেন।
সিরাজগঞ্জ রোড হাটিকুমরুল এলাকার ব্যবসায়ী আবুল কাশেম তার ভায়ের চাকরীর জন্য ২০১২ সালে হান্নানকে ৭ লাখ টাকা প্রদান করে। কিন্তু চাকরী না হওয়ায় টাকা ফেরত দিতে নানা তালবাহানা শুরু করে। পরে একদিন নলকা মোড়ে হান্নানকে ধরে গনপিটুনি দিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দীকের কাছে জমা দেয়া হয়। পরে তিন লাখ টাকা দিলেও বাকী ৪ লাখ টাকার জন্য বিভিন্ন সময় হান্নানের বাড়িতে গিয়ে টাকা না পেয়ে ফিরে এসেছে। এলাকাবাসী জানায়, এর আগে মেহেদী হাসান নামে এক পুলিশ কর্মকর্তার নিকট থেকে ১৩ লাখ টাকা নিয়েছিলো,কিন্তু টাকা ফেরত না দেয়ায় পরে তাকে বাড়ি থেকে পুলিশ দিয়ে ধরে থানায় এনে টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া সিরাজগঞ্জের পাশ্ববর্তী জেলার এক থানার অফিসার ইনচার্জের নিকট থেকে চাকরী দেয়ার নাম করে প্রায় ২৫ লাখ টাকা,সলঙ্গা থানার সাবেক এক এসআই এর নিকট থেকে সাড়ে ১৩ লাখ টাকা নিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও সেই টাকা তারা ফেরত পাচ্ছে না।
২০১৮ সালে রায়গঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের এক শীর্ষস্থানীয় নেতা তার আত্মিয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের চাকরীর জন্য হান্নানকে সাড়ে ৮ লাখ টাকা প্রদান করেন। কিন্তু চাকরী না হওয়ায় সেই টাকা আজ পর্যন্ত ফেরত পাননি।
গত কোরবানীর ঈদে উল্লাপাড়ার এক মহিলার কাছ থেকে কোরবানীর জন্য বাকীতে গরু কেনেন হান্নান,কিন্তু কোরবানীর প্রায় ৮/৯ মাস অতিবাহিত হলেও সেই মহিলা এখনো অধিকাংশ টাকা বুঝে পায়নি। সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন মাছ ব্যবসায়ীর নিটক থেকে বাকীতে লাখ লাখ টাকার মাছ নিলেও তারা টাকা না পাওয়ায় হান্নানকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
শাহজাদপুরের জাতীয় পার্টির নেতা মোক্তার হোসেনের কাছ থেকে ২০১৪ সালের ২৮ অক্টোবর চাউল ব্যাবসার জন্য আব্দুল হান্নান এক কোটি ১৭ লক্ষ টাকা গ্রহন করেন এবং তার বিপরিতে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ঘুরকা শাখার সঞ্চয়ী হিসাব নং ১০৪০/১৩ এর মাধ্যমে ৪৬২০৫৬০ নং চেক প্রদান করে। পরবর্তীতে টাকা প্রদান না করায় আদালতে মামলা করেন মোক্তার হোসেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারের শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া পবিত্র হ্জে পাঠানোর কথা বলে,তত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সেনাবাহিনীতে চাকরী দেয়ার কথা বলেও প্রায় অর্ধশত মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে আব্দুল হান্নান। সে বিভিন্ন সময় মাহবুবুল হানিফের ভগ্নি জামাই, রায়গঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সদস্য, ঘুরকা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি,জেলা বাস মিনিবাস মালিক সমিতি,ট্রাক ও ট্যাংক লরী মালিক গ্রুপের সদস্য পরিচয় দিয়ে থাকেন। তবে এসব সংগঠনের নেবৃবৃন্দ বলেছেন প্রতারক হান্নান তাদের সংগঠনের সাথে জড়িত নয়। রায়গঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাদী আলমাজী জিন্না জানান, হান্নান বড় ধরনের প্রতারক,তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে তবে সে উপজেলা আওয়ামীলীগের ও বাস মালিক সমিতির সদস্য না।
সলঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ তাজুল হুদা জানান,আব্দুল হান্নান অনেক মানুষের সাথে প্রতারনা করেছে,আমাদের কাছে এ বিষয়ে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ তাকে খুজছে,অল্প সময়ের মধ্যে তাকে আটক করা হবে বলে তিনি বলেন।
জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৭ নভেম্বর সলঙ্গা থানা পুলিমের হাতে ইতোপুর্বে সে আটক হয়ে বেশ কিছুদিন জেল হাজতে ছিলো। জেল থেকে বের হয়ে সে আবার প্রতারনা শুরু করে। তার বিরুদ্ধে সলঙ্গা থানায় সেই সময় ৫টি মামলা ছিলো।
সম্প্রতি হান্নান তার নিজ গ্রামে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করে। মাহফিলে মিজানুর রহমান আজাহারী ওয়াজ করবেন বলে মাইকিং সহ নানা প্রচারনা চালান। মাহফিলে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। কিন্তু আজাহারী না আসায় বিক্ষুব্ধ জনতা মঞ্চ,চেয়ার, টেবিল ভাংচুর করে ও হান্নানের বাড়িতে হামলা চালায়। অবশ্য এর আগেই হান্নান গা ঢাকা দেয়।
 

 


স্টাফ করেস্পন্ডেন্ট, সিরাজগঞ্জ ০৩-০৩-২০২০ ০৯:৪২ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 443 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com