অমর একুশে আজঃ বেদনাহত অহংবোধের দিন
২২ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন

  

অমর একুশে আজঃ বেদনাহত অহংবোধের দিন

ডেস্ক রিপোর্টঃ
২১-০২-২০২০ ০১:৪০ পূর্বাহ্ন
অমর একুশে আজঃ বেদনাহত অহংবোধের দিন

একুশ মানে মাথা নত না করা। একুশ মানে দৃঢ়প্রত্যয়ে এগিয়ে চলা। একুশ আমাদের অহঙ্কার, প্রথম বিজয়। বেদনাহত এক রক্তস্নানের শেষে স্বীকৃতির গৌরব।

ভাষার মর্যাদার লড়াইয়ে অনন্য মহিমায় ভাস্বর। তাই আমরা ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদের জীবনদানে বেদনাহত হই, বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। একইভাবে মাতৃভাষা বাংলার সগৌরবে উঠে দাঁড়ানোতে মাথা উঁচু করি আরেকবার।

সব বাধা অতিক্রম করে বাংলাকে পাথেয় করে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করি। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শুধু বাঙালি নয়, পৃথিবীর সব জাতির কাছে আজ ভাষার উৎসবের দিন। আমাদের ‘অমর একুশ’র মহান দিনে পৃথিবীর কয়েক হাজার ভাষার মানুষ দিবসটি পালন করবে আজ।

কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ তার ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ কবিতায় লিখেছিলেন- ‘পাড়ায় পাড়ায় নাটক ব্রতচারী নাচ/মুকুলের মাহফিল-কৃষ্ণচূড়া আর পলাশ ফুল/আর সবুজের স্বরগ্রাম/কলাপাতা-সবুজ, ফিরোজা, গাঢ় সবুজ, নীল/তারই মধ্যে বছরের একটি দিনে/রাস্তায় রাস্তায় উঠে আসে মুষ্টিবদ্ধ হাত/রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই! রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!।’

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথের ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান বদলে দিয়েছিল বাঙালির ইতিহাসের রূপরেখা। বাঙালির প্রতি পাকিস্তানের শোষণের প্রথম সম্মিলিত প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল বাংলা ভাষার অধিকার।

তবে সেটা সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউর, আউয়ালের মতো বাঙালিদের রক্তের বিনিময়ে। আর তাই বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সব আন্দোলন সংগ্রামের অন্যতম সূতিকাগার ভাষা আন্দোলন।

একুশ তাই বাঙালির চেতনায় সদ্য জাগ্রত। আজ তাই সব পথ মিশে যাবে শহীদ মিনারের বেদিতে। শুধু কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নয়, দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা সব শহীদ মিনারে ফুলেল ভালোবাসায় শ্রদ্ধা জানানো হবে ভাষা শহীদদের।

শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অমর একুশের চেতনা আজ অনুপ্রেরণার অবিরাম উৎস। বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগণ ও জাতিগোষ্ঠীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণে এ দিবসটি উদযাপন এক অনন্য উদ্যোগ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, সারা বিশ্বের সব নাগরিকের সত্য ও ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রেরণার উৎস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

তিনি বলেন, বিশ্বের ২৬ কোটিরও বেশি মানুষের ভাষা বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য আমরা ইতিমধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দাবি উত্থাপন করেছি। আমরা বিশ্বের সব ভাষা সংক্রান্ত গবেষণা ও ভাষা সংরক্ষণের জন্য ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছি।

ভাষা শহীদদের আত্মদান নিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সরদার ফজলুল করিম তার এক প্রবন্ধতে লিখেছেন, ‘বরকত-সালামকে আমরা ভালোবাসি। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, বরকত-সালাম আমাদের ভালোবাসে। ওরা আমাদের ভালোবাসে বলেই ওদের জীবন দিয়ে আমাদের জীবন রক্ষা করেছে। ওরা আমাদের জীবনে অমৃতরসের স্পর্শ দিয়ে গেছে। সে রসে আমরা জনে জনে, প্রতিজনে এবং সমগ্রজনে সিক্ত।’

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালে মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়ার পর থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পালিত হচ্ছে।

আজ রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতি একুশের মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ একুশের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে সর্বপ্রথম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর পরপরই শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিবসটি পালনে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, আজিমপুর কবরস্থানসহ একুশের প্রভাতফেরি প্রদক্ষিণের এলাকায় নেয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

আজ ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন। সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। দিবসটি উপলক্ষে সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে এবং বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো একুশের বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে।

এছাড়া দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন উপলক্ষে বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল ইন্সটিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, জাতীয় জাদুঘর, গণগ্রন্থাগার অধিদফতর, শিশু একাডেমিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ-ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে জন্ম নেয় ভাষাবিরোধ। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অস্বীকার করে কৃত্রিম ভাষা উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে। প্রতিবাদে সোচ্চার হন বাংলার বুদ্ধিজীবীরা।

১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন, ‘উর্দু অ্যান্ড উর্দু উইল বি দ্য স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান (উর্দু, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা)।’ সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররা ‘নো’ ‘নো’ ধ্বনি তুলে প্রতিবাদ জানান। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’

পাকিস্তানি শাসকদের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে এ ধরনের গতিবিধি ও কর্মকাণ্ড আন্দোলনের দাবানল সৃষ্টি করে। জিন্নাহর ঘোষণার পর থেকেই তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে বাংলা রাষ্ট্রভাষার জন্য আন্দোলন শুরু হয়।

১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ গঠিত হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরের সব স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা এবং আরবি হরফে বাংলা ভাষার প্রচলনের চেষ্টার প্রতিবাদে ধর্মঘট পালন করে। আর একুশে ফেব্রুয়ারিতে পুরো পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মঘট করার সিদ্ধান্ত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়। ছাত্রদের বিক্ষোভের মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। নিহত হন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, সফিউরসহ নাম না জানা অনেকে। এরপর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন।

রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে পাকিস্তান সরকার। বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এলে একুশে ফেব্রুয়ারিকে শোক দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের রীতি চালু হয়। একুশের পথ ধরেই শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রাম।


ডেস্ক রিপোর্টঃ ২১-০২-২০২০ ০১:৪০ পূর্বাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 546 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com