শিরোনামঃ
নিউজরুম ০৫-১০-২০২০ ১১:২৪ পূর্বাহ্ন |
মাটিকে পুড়িয়ে দক্ষ হাতে রংতুলির আঁচড়ে রঙিন শিল্পে রূপ দেয় মৃৎশিল্পীরা। সৌখিনতার বাহার ছড়ায় মানুষের ঘরে। সেই মৃৎশিল্পীরা রাঙাতে পারছে না নিজেদের জীবনকে। মাটি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন রকমের কারুকার্য প্লাস্টিকের দখলে চলে যাওয়ায় ধীরে ধীরে কমে আসছে মাটির ব্যবহার। এক সময় ব্যস্ত সময় পার করা মৃৎশিল্পীরা এখন কষ্টে জীবন যাপন করছেন।
একসময় ফুলের টব, মুরগীর খাবার রাখার হাতানি, পানির গ্লাস, প্রদীপ, দইয়ের হাড়ি, বাতির কুপি, ফিন্নির বাটি, টাকা জমানোর ব্যাংক, মাটির ফুলদানি, কয়েলদানি, ভাপা পিঠা বানানোর হাড়ি, কলস, গরুর খাবার দেয়ার চাড়ি, বাচ্চাদের খেলনাসহ বিভিন্ন রকম কারুকার্য তৈরি ব্যস্ত সময় পার করা মৃৎশিল্পীরা এখন কষ্টে জীবন যাপন করছেন।
মাটিকে কিভাবে মানুষের ব্যবহার উপযোগি করা হয় এমন প্রশ্নের জবাবে গোদাগাড়ির পালপালপাড়ার মৃৎশিল্পী বিনয় পাল (৪০) জানালেন, প্রথমে খাড়ি থেকে মাটি এনে পানিতে চুবিয়ে রেখে কুচি কুচি করে কেটে ছাকা হয়। সব ধরনের ময়লা পরিষ্কার করে আবার পানির সাথে ছানতে হয়। এরপর নরম মাটিকে হাতের কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের জিনিসে পরিণত করা হয়। তারপর রোদে শুকানো ও রং মাখানো এবং ভাটায় পোড়ানো হয়। সব শেষে আলপনার মতো রং দিয়ে আকর্ষনীয় করে বিক্রি করা হয়। তবে সব জিনিসে আলপনা আঁকা হয় না।
বললেন, পারিবারিকভাবে শেখা মাটি দিয়ে বিভিন্ন রকম জিনিস বানিয়ে একসময় সুখেই ছিলাম। কদর ছিল সবার কাছে মাটির জিনিসের। এখন প্লাস্টিক এসে শেষ করে দিয়েছে আমাদের ব্যবসার। মাটির তৈরি ফুলের টবের জায়গায় প্লাস্টিকের টব কিনছে অনেকে। আগে ফিন্নির জন্য মাটির বাটি লাগতো সেখানে প্লাস্টিকের বাটি ব্যবহার হচ্ছে। মাটির বদনার কথা ভূলেই গেছে সাধারন মানুষরা কারন অনেক আগেই সেখানে প্লাস্টিকের থাবা পড়েছে। অথচ এই প্লাস্টিক জমিতে পচে না, পরিবেশ বান্ধব না।
তিনি আরো বলেন, কয়েকবছর আগে এক ভ্যান মাটি খাড়ি থেকে আনতেন ১০ টাকায়। এখন ৫০ টাকা লাগে। আমাদের কাছে একটি ফুলের টব পাইকারি ১৮ টাকায় নিয়ে যায় শহরে ফুল বাগানের লোকেরা অথচ শহরে বিক্রি করে ৪০ টাকার উপরে। একটি মাটির ব্যাংক আমরা পাইকারি বিক্রি করে যা পাই তাতে শ্রমের দাম ও হয়না। আমরা মাটির জিনিস বানানো ছাড়া অন্য কোন কাজ জানিনা,আবার অন্য পেশায় যেতেও পারছিনা টাকার অভাবে। সব মিলিয়ে খারাপ দিন পার করছি এখন। আয় রোজগার কমে যাওয়ায় বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে। এখন করোনার কারণে আরো খারাপ অবস্থায় আছি সবাই। হাতে কাজ নাই আগের মতো। বর্তমানে তার ঘরে পাঁচ হাজারের বেশি মাটির তৈরি ফিন্নির বাটি পড়ে আছে। হোটেলগুলোতে কেউ কিনতে চাচ্ছেনা প্লাস্টিকের বাটির কারনে।
আরেক মৃৎশিল্পী জীতেন পাল (৬১) জানান, তার দাদা থেকে বাবা এ পেশায় আসেন। বাবার পর তিনি এ পেশায় জড়িয়েছেন। এখন বয়স হয়েছে তাই নতুন করে কিছু করতেও পারছিনা। এ পেশাকে আকড়ে ধরে রাখা ছাড়া কোন উপায় নেই। তবে তাদের পরিবারের একজন সুজন পাল বর্তমানে স্বর্ণকারের দোকান দিয়েছেন এ শিল্পে টিকতে না পেরে। এভাবে এক সময় হয়তো পরিবারের অন্যরাও চলে যাবে।
তিনি আরো জানান, বিশ বছর আগেও এক গাড়ি (গরুর গাড়ি) মাটি বিক্রি করে ইলিশ মাছ খেয়েছেন এখন চার ভ্যান মাটি বিক্রি করেও ইলিশ মাছ খাওয় হয়না। প্রায় সব কিছু প্লাস্টিকের হওয়ায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান, মাটির তৈরি কিছু জিনিস যদি নির্ধারিত করে দেয়া হয় যা প্লাস্টিক দিয়ে বানানো যাবেনা তাহলে এ শিল্প টিকে থাকবে। তাছাড়া টিকে থাকা সম্ভব না। প্লাস্টিকের জিনিস বানানোর কারন হিসেবে বললেন,এটা সহজে ভেঙে যায়না কিন্তু মাটির জিনিস ভেঙে যায়। আবার প্লাস্টিকের জিনিসগুলো হালকা হওয়ায় সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু প্লাস্টিক তো কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি আর পচেও না। এটা পরিবেশ ও শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তাই এটা ব্যবহার বন্ধ করা উচিত। আর মাটি প্রাকৃতিক। সরকারের উচিত মাটির তৈরি জিনিসের ব্যবহার বাড়াতে প্রচারণা বাড়ানো।
পাশেই কাজ করছিলেন কুসুম মালা (৮০)। তিনি জানান, ১২ বছর বয়সে বিয়ের পর থেকে মাটির জিনিস তৈরি করি। আগে মেলা হলে কতো রকমের খেলনা বানাতেন। এখন সব প্লাস্টিকের খেলনা কিনছে। তাই কাজ কমে যাওয়ায় আয় কমে গেছে। কোন রকমে টিকে আছেন সবাই। চোখের সামনে আমাদের কষ্ট দেখে নাতি পুতিরা মাটির কাজে আর আসতে চায় না। কয়েক বছর পর মাটির জিনিসের ব্যবহার ভুলে যাবে যদি প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়তে থাকে।
ঠিকানা : অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
মোবাইল : ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
ইমেল : info@sirajganjkantho.com