যান্ত্রিক বিলাস
১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০১:৩২ পূর্বাহ্ন

  

যান্ত্রিক বিলাস

নিউজরুম
২০-০৪-২০১৯ ০৯:৫৫ পূর্বাহ্ন
যান্ত্রিক বিলাস

নার্গিস আখতার কণকঃ বিনা মুখখানা ভার করে জানালার এক কোনো বসে আকাশ পানে চেয়ে আছে।বাহিরে মেঘলা আকাশ।যেন এখনি ঝুম বৃষ্টি নামবে।মেঘলা দিনের মতো বিনার মনও বেদনা ভারাক্রান্ত। হবে না কেন,এই ঢাকার বস্তা পচা জ্যাম আর কংক্রিটে ঘেরা যান্ত্রিক জীবনের মধ্যে থাকতে থাকতে বিনা বিরক্ত হয়ে গেছে।

 

বেচারা ফরহাদ মানে বিনার স্বামী একজন সৎ সরকারি ইঞ্জিনিয়ার।সারা বেলা অফিস করে ঢাকার জ্যাম ডিঙিয়ে বাড়ি আস্তে আস্তে বেচারার রাত ১০ /১১ টা বেজে যায়।যে একটা দিন শুক্রবার পায় তাতে ৬ দিনের ঘুম দেয় একটানা। বিনা বুঝে সবই তারপর ও আজ ধৈর্য্যের বাঁধ ভেংগেছে।

 

রুপা আস্তে আস্তে করে বিনার পিছনে এসে দারালো।রুপা, বিনার ছোট বোন এইবার তৃতীয় সেমিস্টার পরীক্ষা দিয়েছে।ছিমছাম দেহ আর শ্যামলা বর্ণের চেহারা।মাথা ভর্তি লম্বা চুল।মায়া ভরা দুটি চোখ আর বেশ চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে।

 

তখন ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। বৃষ্টির ফোটা গুলো জানালায় বারি খেয়ে বিনার গায়ে এসে পরছে।ততক্ষণে বিনা রুপার উপস্থিতি টের পেয়েছে।বিনা জানে তার বুদ্ধিমতি বোনটি কোনো সলিউশন নিয়ে হাজির হয়েছে। বিনা জানালা লাগাতে লাগাতে ঠোঁট ফুলিয়ে রুপার দিকে তাকালো।

 

রুপা -আপা আমি একটা প্ল্যান করেছি।এই দেখ ক্যালেন্ডারে কাল পরশু সরকারি ছুটি তার পরদিন শুক্রবার।দুলাভাই কে বল আজ রাতের টিকিট কেটে আনতে।আমরা সমুদ্র বিলাসে যাব।

 

একথা শুনে বিনার ফুলানো ঠোঁট মুহূর্তে স্বাভাবিক আকৃতিতে ফিরে এসে, এক চিলতে আনন্দ জন্মালো ঠোঁটের কোণে।ফোন হাতে নিয়ে বেশ কয়বার ফোন দিল ফরহাদকে।ফরহাদ অফিসের ব্যস্ততায় বার বার ফোন কেটে দিচ্ছে।ফোন না ধরায় বিনা কড়া করে ম্যাসেজ দিলো।

 

বিনা জানে তার এই ম্যাসেজ এ কাজ দিবে।তাই ব্যাগ গোছানোতে লেগে পরলো দুই বোন।যাচ্ছে তিন জন,মাত্র দুই দিনের জন্য কিন্তু বিশাল বিশাল তিনটা ব্যাগ নিয়ে রেডি তারা।

 

এদিকে ফরহাদ তিনটা টিকিট হাতে চোখে মুখে বিশ্ব জয়ের উচ্ছলতা নিয়ে হাজির হয়েছে। কেননা, সরকারি ছুটিতে টিকিট কাউন্টারে লোকের যে ঢল থাকে,এতে ফরহাদ তিনটি টিকিট পেয়ে যুদ্ধে জয়ী হয়েছে বলা যায়।

 

রাত ১০ টা গ্রিন লাইনে এসি বাসের টিকিট।বিনারা হুড়মুড় করে কাউণ্টারে পৌঁছে শুনে যানজটের কারণে গাড়ি ৩০ মিনিট দেরী হবে।

 

রুপা হতাশ হয়ে ওয়েটিং রুমের চেয়ার গুলোতে বসে পরলো।ওয়েটিং রুমে তখন কেবল রাত ১০টার যাত্রীরা অপেক্ষা করছে।

 

রুপা অসহ্য দৃষ্টি তে যাত্রীদের আনা গোনা দেখতে লাগলো হঠাৎ চোখ আটকালো সামনের দেয়ালে সারি করে রাখা চেয়ারগুলিতে। তিনটা চেয়ারে দুই পাশে বয়স্ক দুজন বাবা মা আর মাঝখানে আদরে আটখানা ছেলে।কোকড়ানো চুল, ফর্সা গোলাকাকৃতি মুখে,গোল গোল মোটা ফ্রেমের চশমা।চেহারাতেও বোকা বোকা ছাপ।হাতে এক খানা গল্পের বইয়ের মধ্যে ডুবে আছে। রুপাও দুষ্টু মিষ্টি চোখে ছেলেটিকে লক্ষ করে সময় পার করার চেষ্টা করছে।

 

হঠাৎ ছেলেটি বই থেকে মাথা তুলে তাকালো।রুপার এক দৃষ্টি তাকানোতে সে ভারি অস্বস্তি বোধ করলো।

 

বাস ৩০ মিনিটের জায়গায় ১৫ মিনিট আগেই চলে এসেছে। তখন সবাই বাসে উঠার জন্য ব্যস্ত হয়ে পরেছে।

 

রুপা ভাবতেই পারেনি চার চোখের ছেলেটি রুপার পাশের সিটে বসবে।রুপার পিছনের সিটে বিনা আর ফরহাদ।আর রুপাদের সোজাসুজি পাশের সারিতে চার চোখের ছেলেটির বাবা মা।

 

রাত ১০টা১৫ তে গাড়ি ছাড়লো। দুই দিন ছুটির কারণে রাস্তায় ভিষণ যানজট।গাড়ি এই নড়ছে আবার নড়ছে না। অনেকেই বলছে কক্সবাজার পৌছাতে কাল দুপুর গড়ায়ে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। বিনার ঠোঁট আবার ফুলতে আরম্ভ করলো।ফরহাদের ছুটি কাটিয়ে শুক্রবার ফিরে শনিবার অফিস করতে হবে।তাহলে হাতে থাকে আর একটি দিন।

 

বাস নড়ুক আর না নড়ুক রুপার পাশের ছেলেটি গভীর ঘুমে চলে গেছে। রুপার আবার জার্নিতে ঘুম আসে না।কিছুক্ষণ ছেলেটির ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখলো চার চোখের ঘুমন্ত চেহারা টা এতো নিস্পাপ,যেন সমস্ত মায়া এসে তার চেহারায় উপচে পরেছে।বেচারা বই হাতে চশমা পরে ঘুমিয়ে গেছে।ছেলেটি পরিচিত হওয়ার কোন আগ্রহ না দেখানোয়,তাদের মধ্যে কোন পরিচয় হলো না তখনো।

 

বাইরে সারা রাতই টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। ঢাকা থেকে কুমিল্লা তিন ঘন্টার পথে পৌছাতে তাদের ভোর হয়ে গেলো।কুমিল্লাতে একটি হোটেল এ ২০ মিনিটের যাত্রা বিরতি পাওয়া গেল।রাতের যাত্রা বিরতি ভোরে হলো।

 

রুপা ছেলেটি কে পেয়ে সময় পার করার উপায় খুজে পেলো।হোটেলে গিয়েও রুপার চোখ ছেলেটির উপরে ছিল।পরিচিত হবার জন্য রুপা বেশ কয়বার চোখে মুখে আগ্রহ দেখালো।কিন্তু কোন কাজ হলো না।ছেলেটির দিক থেকে কোন পাত্তা পেল না রুপা।

 

এদিকে বিনার কপালে ভাঁজ পরেছে।কখন পৌঁছে তার কোন ঠিক নেই।এযেন সমুদ্রের মাঝখানে পরে কোন কূলে যাবে ভেবে পায় না।

 

২০ মিনিট পরে বাস আবার যাত্রা আরম্ভ করলো।সামনে বলে রাস্তা ভাংগা আবার একটু যানজট পরবে।তার মানে পৌছাতে ঠিক সন্ধ্যা হবে।

 

রুপার ফোনে ম্যাসেজ আসছে।ওভ্র নামের এক অচেনা ফেসবুক ফ্রেন্ড,”আপনার বাস জার্নির ক্লান্ত চেহারা দেখার সৌভাগ্য হলো।”

রুপা খুব অবাক হলো।ছেলেটির কোন ছবি দেয়া নেই।কোন ইনফরমেশন ও ঠিকমতো দেয়া নেই।এই অপরিচিত লোকটাকে কবে কখন এ্যাড করলো তা মনে পরেছে না রুপার।

ভেবে পাচ্ছে না রুপা,ছেলেটি কোথায় দেখলো।একই বাসের যাত্রী নাকি ২০ মিনিট বিরতির সময় হোটেলে দেখেছে।

 

রুপা উত্তরে লিখলো, আপনি কি আমাদের বাসে আছেন?নাকি হোটেলে দেখেছেন?

ছেলেটি ২০ মিনিট আগে অফলাইন হয়ে গেছে।তার সবুজ বাতিটি ২০ মিনিট আগে বন্ধ হয়ে গেছে।তাই

রুপা উত্তরের আশায় না থেকে ফোন ব্যাগে ঢুকিয়ে চোখ বন্ধ করে চিন্তা করতে লাগলো।

 

সন্ধ্যা ৬ টায় বাস কক্সবাজার পৌছায়।তারা একটি লাক্সারী হোটেলে উঠলো।চার চোখের ছেলেটিকে এক হোটেলে দেখে রুপা মনে মনে খুব খুশী হলো।

 

রাত ১২ টায় রুপার ফোনে আবার ম্যাসেজ, “আজ সারা রাস্তায় নিশ্চয় আমাকে ভেবেছেন তাই না?একটি অনুরোধ করবো রাখবেন কি? কাল বিকেলে আপনি নীল শাড়ী পরে সৈকতে আসবেন।”

 

ম্যাসেজ পরে রুপা খুব অবাক হলো।ভাবতে ভাবতে চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে আসলো।

 

সকালে উঠেই রুপার চার চোখের কথা মনে পরলো। আজকের দিনটি হাতে আছে,আগামীকাল ঢাকা ফিরতে হবে।তাই চার চোখের ছেলেটি কে খুজে রুপা নিজে থেকে কথা বলবে বলে চিন্তা করলো।

 

তবে রুপা নিজেকে নীল শাড়ী তে সাজালো আর কপালে নীল টিপ ।সেই অদৃশ্য মানব হয়তো আজও দূর থেকে দেখে কোন কাব্য রচনা করে ম্যাসেজ দিবে।কিন্তু আজ রুপা মনে মনে কেবল সেই চার চোখের ছেলেকে খুজছে। আজ তার দেখা পাবে কিনা রুপা জানেনা।

 

বিনা আর ফরহাদ দুইজন দুজনার হাত ধরে সৈকত ধরে হেঁটে যাচ্ছে।সমুদ্রের ঢেউ এসে বিনার এতদিনের সব মান অভিমান গুলো নিয়ে যাচ্ছে। আর রুপা সৈকতে দাঁড়িয়ে পা ভিজিয়ে ঢেউ গুনছে।সমুদ্রের ঢেউ এর মত রুপার মনেও দেখা হবে কি হবে না ঢেউ খেলছে।

 

হঠাৎ রুপা শুনতে পেলো কেউ যেন তাকে বলছে,”ধন্যবাদ রুপা।আমার অনুরোধ রাখার জন্য।”

রুপা পাশে তাকিয়ে বেশ অবাক হয় চার চোখের ছেলেটিকে দেখে।

 

চার চোখ -নীল শাড়ীতে আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে।

-কিন্তু আপনি?

-হুম।আমি অভ্র।আপনাকে ফেসবুকে ফলো করতাম। আপনাকে খুব ভালো লাগত কিন্তু কোনদিন বলার সাহস হয় নি। বাস কাউন্টারে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম।ভাবলাম ভাল লাগার মানুষটি আমার সামনে,বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

 

রুপা আর অভ্র ঠিক করলো ঢাকা পৌঁছে তারা বাসায় জানাবে।

 

আগামীকাল আবার যে কতটা সময় রাস্তায় যানজটে কাটাতে হবে সেটা ভাবতে ভাবতে ফরহাদ আর বিনার চোখে ঘুম নেমে আসলো।

 

ফরহাদ কলম হাতে ভাবছে আর একটু পর পর চায়ে চুমুক দিচ্ছে।তার ভ্রমণ কাহিনীটার নাম কি দিবে,যান্ত্রিক বিলাস।


নিউজরুম ২০-০৪-২০১৯ ০৯:৫৫ পূর্বাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 1192 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com