স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই
৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:১৭ অপরাহ্ন

  

স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই

নিউজরুম
১৩-০৫-২০২০ ০৩:৩৮ পূর্বাহ্ন
স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় প্রবেশ বা বাহিরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে রাজশাহী জেলা প্রশাসন। তবে তদারকি না থাকায় প্রতিদিন নানা অজুহাতে এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় মানুষ প্রবেশ করছে। আর ঈদকে ঘিরে রাস্তা, বাজারসহ পাড়া মহল্লায় মানুষ এবং যানবাহনের উপস্থিতি হঠাৎই বেড়ে গেছে। মার্কেট খোলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ব্যবসায়ীরা স্বাস্থ্যবিধি লংঘন করে নানা পন্থায় মার্কেট খুলে ব্যাবসা শুরু করেছেন। সাধারণ জনগণের মধ্যেও যেনো বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভীতি কম। এতে করে নিরাপদ রাজশাহী কতোদিন সংক্রমণ মুক্ত রাখা যাবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকসহ স্বাস্থ্য বিভাগ।
সোমবার স্বাস্থ্য বিভাগের দেয়া তথ্য মতে রাজশাহী বিভাগে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২৪৯ জন। এদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৭০ এবং করোনা আক্রান্ত হয়ে এপর্যন্ত মারা গেছেন ২জন। রাজশাহী জেলায় ১৭ জন আক্রান্ত হলেও, আশার কথা এপর্যন্ত রাজশাহী নগরীতে কেউ আক্রান্ত হয়নি। তবে লকডাউন ভেঙে রাজশাহী নগরীতে প্রতিদিন যেহারে বাইরের মানুষ প্রবেশ করছেন এবং মার্কেট ও রাস্তাঘাটে যে হারে মানুষের উপস্থিতি বাড়ছে তাতে এই নগরী প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এমন অবস্থায় রাজশাহীতে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হলে স্থানীয় হাসপাতাল ও চিকিৎসকেরা কতটুকু প্রস্তুত তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্রা ১৫টি আইসিইউ রয়েছে, যা এই জেলার বা বিভাগের জনসংখ্যার তুলনায় খুবই নগন্যই বলা চলে।
এমন পরিস্থিতিতে জনস্বর্থে ১০ মে মার্কেট খোলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। তবে রবিবার (১১ মে) থেকে স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে প্রশাসনের নজড় এড়িয়ে ব্যবসায়ীরা মার্কেট খুলে ঠিকই তাদের ব্যবসা অব্যাহত রেখেছে। এতে সায় দিয়েছে সাধারণ জনগণ। ফুটপাতে ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে তাদের ব্যবসার পসরা সাজিয়ে বসেছেন। কাচা বাজারগুলোতে পা ফেলার জায়গা নেই। স্বাস্থ্য ঝুঁকি অগ্রাহ্য করে সবাই ছুটছে মার্কেট ও কাচা বাজারে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশসনের তদারকিও কমে এসেছে বলে মত দিয়েছে অনেকেই।
গ্রামে থেকে ঈদের কেনাকাটা করতে রাজশাহী শহরে আসছেন মানুষ। গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও বিভিন্ন উপজেলার সঙ্গে অটোরিকশায় যোগাযোগ স্বাভাবিক থাকায় তারা সহজেই শহরে ঢুকছেন। এতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কেননা, রাজশাহীতে এ পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ১৭ জনের সবার বাড়ি বিভিন্ন উপজেলায়।
সরকারি সিদ্ধান্তে গত রোববার থেকে সীমিত পরিসরে খুলছে দোকানপাট ও শপিংমল। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানেই দোকানপাট না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে সভা করে দোকানপাট-মার্কেট বন্ধ থাকুক, এমন মত দিয়েছেন রাজশাহীর সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান ও সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। কিন্তু তবুও এ শহরের কোনো কোনো ব্যবসায়ী দোকান খুলছেন। সামাজিক দূরত্বের তোয়াক্কা না করেই তারা বেচাবিক্রি করছেন।
এদিকে জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাজশাহী শহরে ফুটপাতে কোনো ব্যবসায়ী, হকার বা ফেরিওয়ালা বসতে পারবেন না। কিন্তু পুলিশ-প্রশাসনের সামনেই নগরীর সাহেববাজার এলাকায় রাস্তার দু’পাশে ফুটপাতে বসছেন হকার, ফেরিওয়ালা, শাড়ি-লুঙ্গি বিক্রেতা, তালা-চাবি-ছাতা মেরামতকারী এবং বেল্ট বিক্রেতারা। স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই তারা বেচাকেনায় মেতে উঠেছেন।
মঙ্গলবার সকালে সাহেববাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আরডিএ মার্কেটের প্রধান ফটক বন্ধ। কিন্তু মূল ভবনের পাশে থাকা কাপড়ের দোকানগুলো থেকে পোশাক বিক্রি করা হচ্ছে। এ জন্য আরডিএ মার্কেটের পাশের সবগুলো গলিতে মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। এসব গলির ওপরেও বিক্রি হচ্ছে প্রয়োজনীয় নানা জিনিসপত্র।
সকালে সাহেববাজার কাপড়পট্টিতে গিয়ে দেখা যায়, দোকানের সাটার নামানো। তবে দোকানের সামনে একজন করে কর্মচারী দাঁড়িয়ে। কেউ সেদিকে গেলেই ওই কর্মচারী জানতে চাচ্ছেন কী লাগবে। তারপর সাটার তুলে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন দোকানে। এরপর আবারও সাটার নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। কেনাকাটা শেষ হলে আবারও সাটার তুলে ক্রেতাকে বের করে দেয়া হচ্ছে।
এভাবে কসমেটিকস, ক্রোকারিজসহ অন্যান্য দোকানেও বিক্রি করা হচ্ছে। সাহেববাজারের মেসার্স করিম অ্যান্ড সন্স নামের একটি কসমেটিকসের দোকানের সাটার তুলে তিন তরুণীকে বের হতে দেখা যায়। এরপর সাটার তুলে ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, ছোট্ট দোকানটির ভেতর ১০ জন তরুণী ও নারী। গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে তারা কসমেটিকস সামগ্রীর দর-দাম করছিলেন। কর্মচারী ছিলেন আরও দুইজন। আর বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কর্মচারী জামাল হোসেন।
এভাবে ক্রেতা ঢোকানোর বিষয়ে জানতে চাইলে কর্মচারী জামাল বললেন, সবাই তো পোটলা (ত্রাণ) নিতে পারবে না। কিন্তু পেট তো আছে। তাই দোকানটা এভাবেই খুলে মালামাল বিক্রি করা হচ্ছে।
কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাটার তুলে একটি দোকানে ঢোকার পর সেখানেই কেনাকাটা করতে হচ্ছে। এতে বিক্রেতারা সবকিছুর অস্বাভাবিক দাম নিচ্ছেন। কিন্তু বার বার এভাবে সাটার তুলে অন্য দোকানে যাওয়া যাচ্ছে না বলে বেশি দাম দিয়েই পণ্য কিনতে হচ্ছে।
এদিকে নগরীর আরডিএ মার্কেট বন্ধ। তাই ভেতরের রাজু ট্রেডার্স নামে একটি ক্রোকারিজের দোকানও বন্ধ। কিন্তু আরডিএ মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানটির কর্মচারী সোহেল পথচারীদের কাছে জানতে চাইছিলেন কী লাগবে। দোকান কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, দোকান মার্কেটের ভেতর। মার্কেট বন্ধ বলে পাশের একটি গলির ওপর মালামাল বের করে রাখা হয়েছে। কিছু প্রয়োজন হলে তিনি সেখানে নিয়ে যাবেন।
সাহেববাজার এলাকায় ফুটপাতে শাড়ি-লুঙ্গি বিক্রি করছিলেন মানিক আলী। ফুটপাতে পসরা সাজানো নিষেধ তা জানেন কি না জানতে চাইলে মানিক জানালেন তিনি জানেন। তাহলে কেন বসেছেন জানতে চাইলে মানিক বলেন, কী করব বলেন? এখন ঈদের বাজার। না বসলে হয়?
সাহেববাজার এলাকায় কথা হয় মোহনপুরের মৌগাছি থেকে আসা গৃহবধূ তাহমিনা খাতুনের সাথে। তিনি জানান, অটোরিকশায় চড়ে বিনাবাধায় তিনি শহরে এসেছেন ঈদের কেনাকাটা করতে। তাহমিনা বলেন, বছরে ঈদ তো দুইটাই, ছেলে-মেয়েকে পোশাক-আশাক না কিনে হলে হয়!
দোকানিরা জানিয়েছেন, শহরের বাসিন্দারা খুব কমই কেনাকাটা করতে আসছেন। এখন যারা কেনাকাটা করছেন তারা গ্রাম থেকে আসছেন। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের অভিজাত পোশাকের শো-রুমগুলোও খুলছে। শহরের অনেক তরুণ-তরুণী সেসব শো-রুমে যাচ্ছেন কেনাকাটা করতে।
রাজশাহীর নিউমার্কেটের একটি গার্মেন্টের দোকানের মালিক জানান, তিনি নিজে একবার ‘ডিমান্ড’ নামে শহরের একটি শো-রুম থেকে পোশাক কিনেছিলেন। তখন তার মোবাইল নম্ববরটি নিয়ে রাখা হয়েছিল। মঙ্গলবার তাকে ওই শো-রুম থেকে এসএমএস দিয়ে জানানো হয়েছে, শো-রুম খোলা আছে। প্রয়োজনে যে কোনো পোশাক কিনতে তিনি সেখানে যেতে পারেন। নিউমার্কেটের ওই ব্যবসায়ী বলেন, নিউমার্কেটে আমাদের দোকান বন্ধ। কিন্তু শো-রুম তো খোলা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সেকান্দার আলী বলেন, যেহেতু এ শহরের জনপ্রতিনিধিরা দোকান বন্ধ রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন তাই আমরাও এর পক্ষে। আমাদের প্রতি ব্যবসায়ীদের চাপ থাকলেও ব্যবসায়ীদের দোকান না খোলার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। এরপরও এটা অমান্য করে যদি কেউ দোকান খোলেন তাহলে তার নিজ দায়িত্বেই খুলতে হবে।
জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করাটা খুব জরুরি। কোথাও স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন হলে তারা ব্যবস্থা নেবেন। এজন্য মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে ভ্যাম্যমান আদালত।


নিউজরুম ১৩-০৫-২০২০ ০৩:৩৮ পূর্বাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে
এবং 257 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
Loading...
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত

  

  ঠিকানা :   অনামিকা কনকর্ড টাওয়ার, বেগম রোকেয়া স্মরনী, তৃতীয় তলা, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা- ১২১৬
  মোবাইল :   ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
  ইমেল :   info@sirajganjkantho.com